খাগড়াছড়ি, , শনিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৮

৭ নভেম্বর ১৯৭৫: একজন স্বাক্ষীর মূল্যায়ন

প্রকাশ: ২০১৬-১১-০৪ ১৪:৫৬:৪২ || আপডেট: ২০১৬-১১-০৪ ১৪:৫৬:৪২

%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%9c%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%b2-%e0%a6%87%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%ae৭ নভেম্বর ১৯৭৫: একজন স্বাক্ষীর মূল্যায়ন

লেখক; মেজর জেনারেল – অব: সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

কেন আজকের কলাম
সময় দেখার প্রয়োজন হলে ঘড়ি দেখতে হয়। হাতে যদি ঘড়ি না থাকে, আগে ঘড়ি খুঁজতে হবে; অতঃপর সময় দেখতে হবে অথবা কাউকে-না-কাউকে সময় জিজ্ঞেস করতে হবে। সময় দেখার পর যদি ওই সময়ের কাজটি করা না হয়, তার জন্য ‘সময়’ দায়ী নয়। দায়ী হবেন তিনিই, যিনি সময় দেখলেন না অথবা যিনি সময় দেখার পরও সময় ও কাজকে অবহেলা করলেন। অবহেলার মূল্য পৃথিবীর বহু দেশ, সমাজ, জাতি ও ব্যক্তি দিয়েছে। আমরাও যে অবহেলার মূল্য দেইনি, সে কথা বলা যাবে না। আবার যেন দিতে না হয়, এ জন্য সাবধান হওয়া প্রয়োজন। আর্থসামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বাংলাদেশের বন্ধু কারা, এ দেশের প্রতি বৈরী কারা এ নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা আবশ্যক হয়ে পড়েছে। আমাদের চিন্তাকে গঠনমূলকভাবে, ইতিহাবাচকভাবে, শান্তিপূর্ণভাবে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এই পুনর্গঠন প্রচেষ্টার ক্ষুদ্র একটি উপাত্ত হচ্ছে আজকের কলামটি। কারণ, ১৯৭৫ সালের দ্বিতীয় অর্ধেক ছিল বাংলাদেশের জন্য এইরকমই একটি ক্রান্তিকাল; কিন্তু আজকের বাংলাদেশের জনসংখ্যার ষাট ভাগের বেশি মানুষ ১৯৭৫ এর পরের জন্ম।

তথ্য ও তথ্যের ব্যবহার
পৃথিবীর ইতিহাসে যেমন পৃথিবীর বা মানবসভ্যতার জন্য অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ তারিখ আছে, বাংলাদেশের ইতিহাসেও এ দেশের মানুষের জন্য, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্য, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের আঙ্গিকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তারিখ আছে। এ রকম একটি তারিখ হচ্ছে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫; সিপাহি-জনতার বিপ্লব দিবস। আজকের কলামটি এ প্রসঙ্গে। ৭ নভেম্বরের আগে-পরে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি এবং টেলিভিশনের টকশোগুলোতে আলোচনা হতেই থাকবে। সঠিক ইতিহাস জানা এবং সেই ইতিহাস থেকে উপযুক্ত শিক্ষা আহরণের স্বার্থে ৭ নভেম্বর প্রসঙ্গে জানা প্রয়োজন। আমার লেখা বই ‘মিশ্র কথন’-এর পঞ্চম অধ্যায়টির নাম ‘১৯৭৫ : রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভাজনরেখা’। পুস্তকের ১৪৬ থেকে ১৯৩ পৃষ্ঠায় নভেম্বরের ঘটনাবলি নিয়েই আলোচনা আছে। পাঠকের জন্য প্রাপ্তির সুবিধার্থে উল্লেখ করলাম, ঢাকা মহানগরের বেইলি রোডের সাগর পাবলিশার্স, চট্টগ্রাম মহানগরের প্রেস ক্লাব দালানে অবস্থিত বাতিঘরসহ সম্ভ্রান্ত দোকানে সন্ধান করলেই ইতিহাসের সন্ধান পাবেন। সাম্প্রতিককালে আবির্ভূত ‘ডিবিসি টিভি’ নামক একটি চ্যানেল গত শুক্র-শনিবারসহ মোট পাঁচ-ছয়টি শুক্র-শনিবারে (জোড়া) ৭ নভেম্বর প্রসঙ্গে আলোচনা করেছে বা করিয়েছে; এই আলোচনার রেকর্ডও ইউটিউবে পাওয়া যাবে। ২৯ অক্টোবর ২০১৬ রাত ১০টা থেকে ১১টার আলোচনায় অংশ নিয়েছিলাম। বৃহস্পতিবার ৩ নভেম্বর ২০১৬ দিনের শেষে রাত ১১:২৫ থেকে ১২:৫০ পর্যন্ত বাংলাভিশনে প্রচারিত আলোচনায় অংশ নিয়েছি; ইউটিউবে এটাও পাওয়া যাবে।

১৯৭৫-এর আগস্টের পেছনের কথা
পঁচাত্তরের নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের ঘটনাবলির উৎপত্তি বা শিকড় নভেম্বরেই নিহিত নয়। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে বাকশাল চালু হয়েছিল। কাজটা অত্যন্ত বিতর্কিত ছিল। এর পরের সপ্তাহ এবং মাসগুলো আপাতদৃষ্টিতে বা ওপরে ওপরে শান্ত ছিল; আসলে তা ছিল না। পেছনের দিকে তাকিয়ে পরিণত বয়সে জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, ওই আমলের বাংলাদেশের রাজনীতির স্রোত, জনমতের স্রোত ও প্রশাসনের আনুগত্যের স্রোত দু’টি ভিন্ন দিকে যাচ্ছিল। দৃশ্যমান ওপরের অংশ সরকারের অনুকূলে বহমান ছিল; অদৃশ্যমান গভীর পানির অংশ সরকারের প্রতিকূলে, তথা উল্টো দিকে ছিল। তৎকালীন অনুগত মিডিয়ায় এবং মিডিয়ার বাইরে ব্যক্তি ও সমষ্টিগত পর্যায়ে সরকারের বন্দনার প্রতিযোগিতা চলত। সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনার অবকাশ বা সুযোগ খুবই সীমিত ছিল। আমরা ১৯৭৫ সালের কথা বলছি। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে আগস্ট মাস এসে গিয়েছিল। দেশের ভেতরের কিছু অপ্রীতিকর কারণ, দেশের বাইরের কিছু ষড়যন্ত্রমূলক কারণ একাকার হয়ে গিয়েছিল। সব কিছুর ফলে ঘটেছিল ১৫ আগস্ট; শোকাবহ ঘটনা ও দিন।

১৫ আগস্টের নায়ক ও খলনায়ক
১৫ আগস্টের ঘটনার নায়ক একজন নয়; সংখ্যায় একাধিক এবং একাধিক অঙ্গনের। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কিছুসংখ্যক মধ্যম আর কনিষ্ঠ সারির কিছু অফিসার একটি আঙ্গিকের ও একটি অঙ্গনের নায়ক। দু-একটি উদাহরণ দিই। তৎকালীন ৪৬ পদাতিক ব্রিগেডের সংগঠনভুক্ত তথা ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিল বীর বিক্রমের কমান্ডের অধীনে থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি ঘটনাবলিতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল। ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিলের অগোচরে আর্টিলারি রেজিমেন্টের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল খন্দকার আব্দুর রশীদ তলে তলে বিদ্রোহের পরিকল্পনা করেছিলেন এবং বাস্তবেও বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন। সেনাবাহিনী সদর দফতর বা হেডকোয়ার্টারের চিফ অব দ্য জেনারেল স্টাফ সংক্ষেপে সিজিএসের কমান্ডের অধীনে থাকা অবস্থায় বা সিজিএসের সরাসরি অধীনস্থ থাকা অবস্থায় তৎকালীন সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমের অগোচরে বা গোপনে গোপনে বিদ্রোহের প্রস্তুতি ও বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিল একটি সাঁজোয়া ইউনিট বা আর্মার্ড কোরের রেজিমেন্ট, যার নাম ছিল : প্রথম বেঙ্গল ল্যান্সার। অর্থাৎ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের অগোচরে এবং গোয়েন্দাদের দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে তলে তলে ল্যান্সারের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান বিদ্রোহের পরিকল্পনা করছিলেন। তাদের সাথে যুক্ত ছিলেন চাকরিরত ও অবসরপ্রাপ্ত অন্যান্য অফিসার। এটা গেল একটি আঙ্গিকের ও একটি অঙ্গনের কথা। এখন অন্য একটি আঙ্গিকের কথা বলি। স্বাধীনতার আগে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দুই দশকের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ও সহচর ছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। মুক্তিযুদ্ধকালে বঙ্গবন্ধুর নামের ওপর প্রতিষ্ঠিত প্রবাসী সরকারের মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য ছিলেন খন্দকার মোশতাক। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন ক্যাবিনেটের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। এই খন্দকার মোশতাকের সঙ্গী দুই শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতা ও সংসদ সদস্য ছিলেন আরেকটি আঙ্গিকের নায়ক বা নায়কমণ্ডলী। দেশের বাইরের নায়কদের নামও এত দিনে সবার প্রায় জানা হয়ে গেছে। তবে সেনাবাহিনী থেকে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের নিয়ে যত কথাবার্তা হয়েছে এবং বিদেশী নায়ক বা নায়কমণ্ডলী নিয়ে যত কথাবার্তা হয়েছে, তার চেয়ে বহু অংশে কম আলোচনা-সমালোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বাধীন এবং বঙ্গবন্ধুবিরোধী ১৫ আগস্ট-পরবর্তী আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় সদস্যদের নিয়ে।

১৯৭৫-এর তিনটি ব্যস্ত মাস
আমরা ১৯৭৫-এর কথা বলছি। ওই আমলের বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, অর্থাৎ ’৭৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ অংশ বা সেনাবাহিনীর উচ্চতম পর্যায়ের অফিসারেরা ব্যস্ত ও তৎপর ছিলেন তাদের ওইসব সদস্যকে নিয়ে, যারা ১৫ আগস্টের সাথে জড়িত ছিলেন। ওই আমলের সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ ও মধ্যম সারির বেশির ভাগ কর্মকর্তার চিন্তা ছিল, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেঙে যাওয়া চেইন অব কমান্ডকে জোড়া লাগানো বা পুনঃস্থাপন করা। পাঠক প্রশ্ন করতে পারেন, কেন? যেহেতু ১৫ আগস্টের ঘটনায় জড়িত অফিসারেরা তাদের উপরস্থ জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের অনুমতি ছাড়াই এতে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের কী হবে, এটাই ছিল বিবেচ্য বিষয়। আগস্টের ২৪ তারিখ থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন তৎকালীন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম। সেনাবাহিনী অত্যন্ত ব্যস্ত দিন কাটাচ্ছিল। ১৯৭২ সাল থেকে ক্রমান্বয়ে সৃষ্টি হওয়া জাতীয় রক্ষীবাহিনী বা জেআরবি নামক সংগঠনটিকে ভেঙে দেয়া হয়নি বা বাতিল করা হয়নি; বরং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যে একীভূত বা আত্মীকৃত করে ফেলা হয়েছিল। উল্লেখ্য, জাতীয় রক্ষীবাহিনীর বেশির ভাগ সদস্য রণাঙ্গনের তরুণ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। সিদ্ধান্ত প্রদানকারী ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের সাথে যেসব স্টাফ অফিসার কাজ করছিলেন, তাদের মধ্যে একজন ছিলাম আমি নিজে। ওই সুবাদে বলছি, সময় খুব ব্যস্ত ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ছিল। এর মধ্যে চাপা অবস্থায় বিরাজমান ছিল ওই দ্বন্দ্ব। দ্বন্দ্বটি কী? তা হলো, যারা ১৫ আগস্ট সংঘটিত করে ফেলেছেন তারা কোথায় যাবেন, কোন অবস্থায় থাকবেন, কোন দায়িত্বে থাকবেন? নাকি, তাদের দ্বারা সংঘটিত কৃতকর্মটিকে শৃঙ্খলা ভঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করে সেটার বিহিত করা হবে? সমাধান পাওয়া যাচ্ছিল না; ঐকমত্য সৃষ্টিতে বিলম্ব হচ্ছিল।

খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম
এরূপ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদর দফতরে কর্মরত, সুনামধারী, মেধাবী, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সাহসী সেক্টর কমান্ডার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমের নেতৃত্বে একটি প্রতিবাদী কর্মকাণ্ড অথবা কারো কারো দৃষ্টিতে সংশোধনমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়। সামরিক পরিভাষায় বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় এটি ছিল একটি ক্যু-দেতা। বাংলায় বলা যেতে পারে সামরিক অভ্যুত্থান। এর অংশ হিসেবে খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম তার ওপরস্থ কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করেছিলেন। অভ্যুত্থানের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ১৫ আগস্টের সশস্ত্র নায়কেরা, ঢাকা কেন্দ্রীয় জেলখানায় বন্দী অবস্থায় থাকা চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করেন অথবা করান। অভ্যুত্থানের ফলে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ এস এম সায়েমকে নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল; মোশতাক কর্তৃক জারি করা সামরিক শাসন অব্যাহত ছিল; কিন্তু কিছু লক্ষণের কারণে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানটি রাজনৈতিক অঙ্গনে, সচেতন জনগণ ও সৈনিকদের মনে ‘ভারতপন্থী’ অভ্যুত্থান হিসেবে রঙ পায়। সচেতন জনগণ ও সৈনিকেরা তাই এটা পছন্দ করেননি। পরবর্তীকালে বিষয়টি মোটামুটি স্পষ্ট হয়েছিল; কিন্তু তত দিনে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা, লে. কর্নেল এ টি এম হায়দার বীর উত্তমের মতো মুক্তিযোদ্ধারা বিগত হয়েছেন।

(গোপন) ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ এবং জাসদের সাথে সম্পর্ক
৩ নভেম্বর ১৯৭৫-এর ঘটনার পর আরেকটি গোপন গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে ওঠে। তৎকালীন জাসদের অনুপ্রেরণা, পৃষ্ঠপোষকতা, আগ্রহ ও প্রয়োজনে (১৯৭৩-এর শেষাংশ থেকে) তৎকালীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে একটি গোপন সংগঠন কাজ করত। সংগঠনটির নাম ছিল বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা। এই বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সাথে যোগাযোগ ছিল সেনাবাহিনীর বাইরের একটি সংগঠনের, সেটি ছিল জাসদ নামের রাজনৈতিক দলের গোপন অঙ্গসংগঠন; যার নাম ছিল গণবাহিনী। জাসদের আনুষ্ঠানিক নেতৃবৃন্দ ছাড়া আরো একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি এ প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন। তিনি ছিলেন জাসদের গণবাহিনীর প্রধান, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার, অন্যতম মেধাবী সাহসী সেনাকর্মকর্তা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মোহাম্মদ আবু তাহের বীর উত্তম। জাসদ, গণবাহিনী ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা চাচ্ছিল, একটা বড় রকমের বিপ্লব সাধন হোক। এ লক্ষ্যে তারা কাজ করছিলেন অনেক দিন ধরেই। ৩ নভেম্বরের ঘটনা ঘটে যাওয়ায় তারা সবাই অস্থির হয়ে পড়লেন এবং মনে করলেনÑ ‘আবার কোন অপরিকল্পিত ঘটনা হঠাৎ এসে তাদের বিপ্লবের পক্ষে বাধার সৃষ্টি করে।’ তাই তারা স্থির করলেন ৭ নভেম্বর তারিখে তাদের কাজটি করে ফেলবেন। তাদের মধ্যে যারা চরমপন্থী বা উগ্রপন্থী, তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, সেনাবাহিনী হতে হবে অফিসারমুক্ত। তারা ঘোষণা দিলেনÑ ‘সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই, অফিসারের রক্ত চাই।’

জিয়াকে মুক্ত করার প্রেক্ষাপট
ঠিক একই সময়ে, অর্থাৎ ৩ নভেম্বরের পরের দিনগুলোতে অন্যান্য স্তরে প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে আলোচনা ও চিন্তা চলছিল, জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতে হবে। জিয়াউর রহমানকে বন্দী করাকে সাধারণ সৈনিকেরা কোনো মতেই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারেননি; সৈনিকেরা বেদনাহত হয়েছিলেন। সঠিক হোক বা বেঠিক হোক, ৪ ও ৫ নভেম্বরের মধ্যেই ধারণা জন্মেছিল, যদি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা না যায়, তাহলে দেশ বিপ্লবীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। অতএব তাকে মুক্ত করতেই হবে। বলা বাহুল্য, জিয়াউর রহমান দেশবাসীর কাছে সুপরিচিত ছিলেন প্রথমে নিজের নামে এবং পরে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার কারণে। জিয়াউর রহমান সুপরিচিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের অন্যতম জ্যেষ্ঠ সেনাপতি হিসেবে এবং সুপরিচিত হয়ে উঠেছিলেন একজন ডায়নামিক ও ক্যারিশমেটিক সেনাবাহিনী উপপ্রধান ও পরবর্তীকালে প্রধান হিসেবে। ১৯৭২-এর এপ্রিলে সবাই আশা করেছিলেন, জিয়াউর রহমানই সেনাবাহিনীর প্রধান হবেন; কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক তখনকার সরকার তাকে সেনাবাহিনীর প্রধান বানায়নি। বানিয়েছিল তারই ব্যাচমেট বা কোর্সমেট কিন্তু জ্যেষ্ঠতার তালিকায় জুনিয়র, তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত ও তুলনামূলকভাবে কম ক্যারিশমেটিক তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার কে এম সফিউল্লাহকে। জিয়াউর রহমানকে বানানো হয়েছিল উপ-সেনাবাহিনী প্রধান। যথাক্রমেÑ সেনাবাহিনী প্রধান বা উপপ্রধান নিযুক্ত হওয়ার কিছু দিন পর সফিউল্লাহ ও জিয়াউর রহমান উভয়েই মেজর জেনারেল হলেন। সৈনিকদের এরূপ মানসিক প্রেক্ষাপটে ৩ নভেম্বরের পর থেকেই নিজ বাসভবনে গৃহবন্দী জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার কাজটি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছিলেন সাধারণ সৈনিকেরা।

৭ নভেম্বরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড
৬ নভেম্বর দিনের শেষে রাত ১২টায় ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ শুরু হয়। সেই সাথে সৈনিকদের বিপ্লব শুরু হয়ে যায়। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই সৈনিকদের বিপ্লবটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়। বড় অংশে ছিল অরাজনৈতিক মনোভাবসম্পন্ন নিখাদ বাংলাদেশ-প্রেমিক, জিয়া-প্রেমিক সৈনিকেরা। ছোট অংশ ছিল জাসদের প্রভাবান্বিত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্য ও অনুসারীদের। ঘণ্টা তিনেকের মধ্যেই ঢাকা মহানগরের জনগণ জড়ো হতে থাকেন। সূর্যোদয়ের ঘণ্টা দুয়েকের আগ থেকেই ক্যান্টনমেন্ট থেকে সৈনিকেরা মহানগরে ছড়িয়ে পড়েন। রাতের মধ্যেই ক্যান্টনমেন্টের বিভিন্ন অংশে একাধিক অফিসার ও অফিসারের পত্নী বিদ্রোহী বা বিপ্লবী সৈনিকদের হাতে নিহত হন। তবে কেউ কাউকে চিহ্নিত করতে পারেননি। ব্যক্তিগতভাবে এই পর্যায়ে আমার মুক্তিযুদ্ধকালীন ব্যাটালিয়ন দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে উপস্থিত থেকে ঘটনাবলির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম। দ্বিতীয় বেঙ্গলের সৈনিকেরা কোনো কিছুর সাতে-পাঁচে ছিলেন না; কিন্তু ৭ তারিখের প্রথম প্রহর তথা রাত ১টা-দেড়টা থেকে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থাপন্থী অর্থাৎ বিপ্লবী সৈনিকেরা, শান্তিপ্রিয় শৃঙ্খলাপন্থী দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের তিন দিক থেকে বৈরী প্রচারণা ও আক্রমণাত্মক কর্র্মকাণ্ড প্রকাশ্যে শুরু করে দেয়। উপস্থিত জ্যেষ্ঠতম অফিসার হিসেবে আমি পুরো ব্যাটালিয়নকে নিয়ন্ত্রণে রাখি। জাসদপন্থী বিপ্লবী সৈনিকেরা যেন দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সীমানার ভেতর অনুপ্রবেশ করতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করি। কোনো অবস্থাতেই যেন, যে যে পন্থীই হোক না কেন, সৈনিকে-সৈনিকে পারস্পরিক গুলিবিনিময় না হয়, সেটা নিশ্চিত করার জন্য পন্থা আবিষ্কার করি। অতঃপর দ্বিতীয় বেঙ্গলের সৈনিকদের সিপাহি-জনতার বিপ্লবে যোগদানে সহায়তা করেছি। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫। জাসদপন্থী সৈনিকদের ও জাসদ কর্মীদের বিপ্লব সূর্যোদয়ের ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পানিতে যেমন চিনি গলে যায়, ওই রকমভাবে বিলীন হয়ে যায়। জীবিত থাকে এবং শক্তিশালী হয়ে ওঠে জিয়া অনুরাগী হাজার হাজার সৈনিক ও জনগণের সম্মিলিত বিপ্লব। সেই অবধি এই দিনের নাম হয়েছে সৈনিক-জনতার বিপ্লব বা সিপাহি-জনতার বিপ্লব তথা বিপ্লব ও সংহতি দিবস।

জিয়ার ভূমিকার মূল্যায়ন
১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে শুরু হওয়া প্রায় আড়াই-তিন মাসের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির শেষে এক অগ্নিগর্ভ মুহূর্তে জিয়াউর রহমান বীর উত্তম সেনাবাহিনীর দায়িত্বের অতিরিক্ত, কিন্তু অবশ্যই পরোক্ষভাবে পুরো দেশ ও জাতির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। বিভক্ত জাতিকে সংহত করার কঠিন প্রক্রিয়া শুরু করেন। ৭ নভেম্বরের বিকেল থেকেই পরবর্তী দেড়-দুই দিনের চ্যালেঞ্জ ছিল, সৈনিকদের হাতে হাতে ঘুরছিল যেসব অস্ত্র, সে অস্ত্রকে অস্ত্রাগারে ফেরত আনা; পথে পথে ঘুরছিল যে সৈনিক, সেই সৈনিকদের নিজেদের ব্যারাকে ফেরত আনা। জিয়াউর রহমান অত্যন্ত শান্ত, কিন্তু দৃঢ় মনোভাব ও বক্তব্যের মাধ্যমে সৈনিকদের ওপর অফিসারদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃস্থাপনের কাজ শুরু করেন। সৈনিকেরা যেন অস্ত্র জমা দেয়, সেটি নিশ্চিত করেন। সৈনিকদের মনে পুঞ্জীভূত কষ্টগুলো দূর করার জন্য তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। দুই দিনের পুরনো একজন রাষ্ট্রপতি ছিলেন, অর্থাৎ ৫ নভেম্বর সকালে নিযুক্ত রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। কোনো মন্ত্রিসভা ছিল না। ওই মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি সায়েম বাংলাদেশ কিভাবে পরিচালনা করতেন, সেটা একটি গবেষণার বিষয়। সে মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি সায়েম, জিয়াউর রহমানসহ তিনজন বাহিনীপ্রধানের সহায়তা গ্রহণ করেন এবং বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক কারণেই বৃহত্তম বাহিনী তথা সেনাবাহিনীর যিনি প্রধান, সেই মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের সহায়তাই তিনি সর্বাধিক গ্রহণ করেছেন। অনেক দিন ধরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি তথা প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক সায়েম এবং মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানসহ মোট তিনজন উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মিলেই সরকারের নীতিনির্ধারণী দায়িত্ব পালন করেন। একটি কঠোর ও গভীর গভর্ন্যান্স ক্রাইসিস থেকে বাংলাদেশকে উদ্ধার করেছিলেন জিয়া ও তার সহকর্মীরা। উদারভাবে মূল্যায়ন করলে এটা বলাই যায়, একান্তভাবেই হারিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছিল বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব। সেই অভিনন্দন পাবেন জিয়াউর রহমান এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

২০১৬ সালের সাথে সম্পর্ক কী?
৪১ বছর পর ওই ঘটনাবলি সম্পর্কে ওপরের অনুচ্ছেদগুলোতে অতি সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন রাখলাম। উদ্দেশ্য, আমাদের জাতিকে সুসংহত করার কাজে অতীতের অভিজ্ঞতা যেন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী উচ্চপদের ব্যক্তিত্বদের কাজে লাগে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নদীতে দু’টি স্রোত। দৃশ্যমান স্রোত সরকারের অনুকূলে, ঢেউবিহীন ধীর গতির স্রোত। দৃশ্যমান স্রোতের নিচে অদৃশ্য যে স্রোত, সেটি সরকারের প্রতিকূলে। বঙ্গবন্ধুর আমলে বিদেশী রাষ্ট্রের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শুভাকাক্সক্ষী এবং তার প্রতি বৈরী ও অশুভাকাক্সক্ষী যে রকম ছিল, সে রকম বঙ্গবন্ধুকন্যার ক্ষেত্রেও আছে। তবে বঙ্গবন্ধুকন্যার ক্ষেত্রে বন্ধুভাবাপন্ন বিদেশী রাষ্ট্রগুলো এবং বৈরীভাবাপন্ন বিদেশী রাষ্ট্রগুলো প্রতিটিই নিজ নিজ নিয়মে অনেক বেশি সচেতন, সজাগ, সতর্ক ও গোছানো। বঙ্গবন্ধুর আমলে রাজনৈতিক ময়দান ছিল সীমিত। বঙ্গবন্ধুকন্যার আমলে রাজনৈতিক ময়দান অনেক বেশি বিস্তৃত। অতএব, খেলার মাঠ বড় হলে অনেকগুলো টিম মাঠের একেক অংশে খেলতে পারে। অনেক লোক একসাথে খেললে বা অনেক টিম এক মাঠে খেললে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে যায়। ফলে বেশি সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন পড়ে।

পরিবর্তন অবশ্যই প্রয়োজন
এরূপ প্রেক্ষাপটে আমরা কী করতে পারি? সম্মানিত পাঠক ও প্রিয় দেশবাসী, সবাই মিলে চিন্তা করতে হবে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী? আমি রণাঙ্গনের সৈনিক যেমন ছিলাম, অবসরজীবনে কলমসৈনিকও বটে। মাথার চিন্তা, বুকের সাহস, হাঁটার শক্তি, সাধারণ মানুষকে বুকে টেনে নেয়ার সহজাত অভ্যাস আমাকে শক্তি জোগাচ্ছে রাজনীতির অঙ্গনে। আমি রাজনৈতিক কর্মী। আমি মনে করি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের কর্মীদেরই এ দায়িত্ব নিতে হবে। আমাদের রাজনীতিতে বহু আঙ্গিকে গুণগত পরিবর্তন অতি প্রয়োজনীয়। যদি এ পরিবর্তন আনতে আমরা চেষ্টা না করি, দেশের ক্ষতি হবে অপূরণীয়। ‘রাজনীতি’ নামক শব্দটির সংজ্ঞা অভিধান বা ডিকশনারিতে নতুন করে লিখতে হবে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

পূর্বের সংবাদ

October 2018
M T W T F S S
« Sep    
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  

এই সপ্তাহের আলোকিত পাহাড় প্রথম পাতা

এই সপ্তাহের আলোকিত পাহাড় শেষ পাতা

বিজ্ঞাপন

error: Content is protected !!