খাগড়াছড়ি, , শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০১৯

বাজেটে উপেক্ষিত প্রাথমিক শিক্ষা

প্রকাশ: ২০১৮-০৬-১৪ ১৮:৪৪:২৮ || আপডেট: ২০১৮-০৬-১৪ ১৮:৪৪:২৮

সিদ্দিকুর রহমান:
দেশের তৃণমূল গরিব মানুষের সন্তানদের শিক্ষালাভের একমাত্র আশ্রয়স্থল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বঙ্গবন্ধু ও তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গরিব মানুষের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করেছেন। বিনামূল্যে বই বিতরণসহ নানা উদ্যোগের জন্য বর্তমান সরকার শিক্ষাবান্ধব হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে।

২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে ৫৩ হাজার ৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে ২২ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। এ বরাদ্দের মধ্যে বিদ্যালয়বিহীন এলাকায় ১ হাজার বিদ্যালয় স্থাপন, উপবৃত্তি, পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, স্কুল ফিডিং কার্যক্রম, ছেলেমেয়েদের জন্য পৃথক ওয়াশব্লক, ৬৫ হাজার শ্রেণীকক্ষ, ১০ হাজার ৫০০ শিক্ষককক্ষ, ৫ হাজার বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর এবং ৩০ হাজার খেলার সামগ্রী বিতরণ করার কথা বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে যেসব চ্যালেঞ্জ মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের অন্তরায়, সেগুলোর বিষয়ে বাজেটে সুস্পষ্ট উল্লেখ নেই।

বর্তমান সরকারের বিনামূল্যে বই বিতরণের বিশাল অর্জন ম্লান করে দিচ্ছে নোট-গাইড ও কোচিং বাণিজ্য। বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট এ অপবাণিজ্য প্রসারের অন্যতম কারণ। শিক্ষক সংকটকে শূন্যের কোঠায় রাখার কোনো প্রতিশ্রুতি ও বরাদ্দ প্রস্তাবিত বাজেটে নেই। শিক্ষকদের পাঠদানবহির্ভূত কাজ থেকে অব্যাহতিদানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীর জরুরি প্রয়োজন। ৫ম শ্রেণীর পরীক্ষার বিশাল কর্মযজ্ঞ।

উপজেলা শিক্ষা অফিসে অতিরিক্ত লোক নিয়োগ না হওয়ায় শিক্ষকরা পাঠদান ব্যাহত করে সমাপনী পরীক্ষার কর্মযজ্ঞে সময় দিচ্ছেন। এতে গরিব মানুষের সন্তানরা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জনসাধারণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার মান নিয়ে নানা অপবাদ দেয়। গরিব মানুষও তাদের সন্তানদের শিক্ষাদানের বিষয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

প্রাথমিকে তিনটি পরীক্ষা ছাড়াও মডেল টেস্ট নামে পরীক্ষা জায়েজ করে দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক হলেও কমপক্ষে ২০০ টাকা ফি দিয়ে গরিব মানুষের সন্তানদের পরীক্ষা দিতে হয়। পাশাপাশি বেশিরভাগ শিক্ষার্থী নোট-গাইড, কোচিং বাণিজ্য থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

প্রতিটি উপজেলায় বছরে কমপক্ষে ২-৩ লাখ টাকা পরীক্ষা বাবদ উদ্বৃত্ত থাকে। কর্তৃপক্ষ নানাভাবে ভাউচার দেখিয়ে সেই টাকা নিঃশেষ করে দিচ্ছে। মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি জেনেও নীরবতা পালন করছেন। কেন এ নীরবতা? মনে হয় নোট-গাইড, কোচিং বাণিজ্য ও পরীক্ষার উদ্বৃত্ত টাকার সঙ্গে তাদের রয়েছে গভীর মিতালি।

প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড ও সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড নিয়ে তাদের যৌক্তিক দাবি সম্পর্কে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী বিভিন্ন সময় বৈঠকে ইতিবাচক মতামত রেখেছেন। অথচ বেতনবৈষম্য সৃষ্টি করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাঝে হিংসাবিভেদ সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। এতে প্রধান শিক্ষকদের প্রশাসনিক কাজ বিঘ্ন হচ্ছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী প্রাথমিকের সহকারীদের নেতাদের জুস খাইয়ে অনশন ভাঙিয়ে সময়ক্ষেপণ করে চলেছেন। এ সম্পর্কে আমি আমার বক্তব্য একটি গানের কলি দিয়ে তুলে ধরতে চাই : ‘এই দিন দিন নয় আরও দিন আছে।’

প্রাথমিক শিক্ষক সমাজ বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সময়ক্ষেপণ না করে প্রাথমিকে সব বৈষম্যের অবসানে এবারের বাজেটে বরাদ্দ রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। সারা বিশ্বে সবার কর্মঘণ্টা ৮, অথচ মে দিবসের অঙ্গীকার উপেক্ষা করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দফতরি-কাম-প্রহরীদেরও ২৪ ঘণ্টা ডিউটিতে নিয়োজিত রাখা হচ্ছে। অপরদিকে তাদের চাকরি হল ছুটিবিহীন। প্রাথমিক শিক্ষকরা সরকারি, অথচ একই ভবনের দফতরি-কাম-প্রহরীরা অনেকটা প্রাচীনকালের ক্রীতদাসের সমতুল্য। স্বাধীন ও সভ্য দেশে বিষয়টি অনেকটাই স্পর্শকাতর ও হৃদয়বিদারক। প্রাথমিকের দফতরি-কাম-প্রহরীদের চাকরি জাতীয়করণ করা মানবিক ও যৌক্তিক দাবি।

আমাদের প্রিয় দেশটিকে উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে নিয়ে যাওয়ার জন্য বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করে আসছে। কিন্তু শিক্ষা খাতে বিনিয়োগে ঘাটতি উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। আগামী প্রজন্ম ও দেশের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট বিনিয়োগ হল শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ। মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষার প্রসারের বিকল্প নেই।

একটি দেশের শিক্ষা খাতে মোট জাতীয় আয়ের ৬ শতাংশ বা বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আদর্শ হিসেবে ধরা হয়। অথচ এ দেশে জাতীয় আয়ের ৩ শতাংশের এবং বাজেটের ১২ শতাংশের কম বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়। বিশ্বের বেশিরভাগ বাজেটে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলা হয়। আমাদের শিক্ষা বাজেটে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে দেশের অগ্রগতির মূলে অন্তরায় সৃষ্টি করা হচ্ছে।

মানসম্মত শিক্ষা ও শিক্ষক গড়ার লক্ষ্যে স্বাধীনতার চার দশক পর সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে। এ শিক্ষানীতির অন্যতম অঙ্গীকার প্রাথমিক শিক্ষাকে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত করা। ফলে তৃণমূলের সাধারণ মানুষের সন্তানরা বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ পাবে। অথচ সরকার এ বিষয়ে বাজেটে বরাদ্দ না রেখে পিছু হটছে। শিক্ষায়, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় এহেন মনোভাব মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম অন্তরায়। প্রাথমিক শিক্ষার সমস্যা নিরসনে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা হবে, এটা সময়ের দাবি।

মো. সিদ্দিকুর রহমান : আহ্বায়ক, প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

পূর্বের সংবাদ

April 2019
M T W T F S S
« Mar    
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930  

এই সপ্তাহের আলোকিত পাহাড় প্রথম পাতা

এই সপ্তাহের আলোকিত পাহাড় শেষ পাতা

বিজ্ঞাপন