খাগড়াছড়ি, , শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮

‘আব্বু, তুমি কান্না করতেছো যে…’

প্রকাশ: ২০১৮-০৬-০২ ১৬:৩৭:৩৩ || আপডেট: ২০১৮-০৬-০২ ১৬:৩৭:৩৩

তুষার আবদুল্লাহ নির্ঘুম রাতের গল্প শুনছি। সহকর্মীদের চোখে ক্লান্তি, অবসাদ। পথে দেখেছি সহযাত্রীদের বিশ্রামহীন চোখ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্ঘুম রাতের অনুগল্প। জৈষ্ঠ্যের বায়ুর ওজনটাও বুঝি গেছে বেড়ে। নিজেও যে স্বাচ্ছন্দ্যে আছি বলতে পারছি না। অন্ধকারে দুইচোখ নিয়ে বসেছিলাম সারারাত। চোখ কেবল অন্ধকারই দেখেছে। এখনও দেখছে। বুকের কম্পন শুনতে পাচ্ছি। কোনটা যে নিজের, আর কোনটা পাশের মানুষের, আলাদা করতে পারছি না। উদ্বেগ,উৎকণ্ঠায় কম্পমান সবাই। কাল কন্যার চোখে চোখ রাখতে পারিনি। কেবল তাকে জাপটে ধরে রেখেছি, নিরাপদ জমিনতো তাকেই ভাবি। তারও নিশ্চিত জমিন-বাবা। সেই জমিন নিয়ে আতঙ্কিত কন্যাকূল, বাপ সম্প্রদায়ও। টেলিফোন বেজে ওঠে, সেল্যুলারের পর্দায় পরিচিত নম্বর। বুঝতে পারি কন্যা আবদার করবে-‘বাবা তাড়াতাড়ি এসো। দেরি করবে না’। আমি,আমরা কতটুকু জানি, কন্যার কাছে জলদি ফিরে যেতে পারবো কিনা। টেকনাফের কাউন্সিলর একরামকে তার কন্যা ডেকেছিল-একরাম ফিরে যেতে পারেননি মেয়ের কাছে। রাষ্ট্র বলছে কতিপয় ‘ভুল’ বাবাকে ফিরতে দেয়নি কন্যার কাছে।

আমরা জানলাম একরাম কন্যার সেই প্রশ্নের উত্তর, ‘আব্বু, তুমি কান্না করতেছো যে…’ উত্তর জেনেছি-‘দু-একটা ভুল’। অস্পষ্টতা। এবং তদন্তের মাইলফলক। এই উত্তর কন্যার জমিনে বাবাকে আর হাসিমুখে ফিরিয়ে দেবে না।

দুই সপ্তাহ আগে লিখেছিলাম ঝিমুচ্ছে বাংলাদেশ। মাদকের আসক্তি ছেড়ে জেগে উঠতে পারছে না বাংলাদেশ। জনপদের এমন কোনও শহর, গ্রামগঞ্জ নেই, এমন কোনও পেশা নেই যেখানে মাদকের ছোবল পড়েনি। মাদকের ছোবল পড়েছে যে পরিবারে, সেই পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। পরিবারের ভাঙন মাদকের আগ্রাসনে। লেখা প্রকাশের দুইদিন পরই দেখি দেশ ব্যাপী মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়ে গেছে। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ান র‌্যাব মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। প্রধানমন্ত্রীও মাদকের বিরুদ্ধের এই অভিযানে তার দৃঢ় অবস্থান প্রকাশ করেছেন। মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জনপদে স্বস্তি নিয়ে এসেছিল একথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শহর-গ্রামে মাদক বিক্রেতা ও সেবনকারীদের পদচারনা ও ভিড়ও কমতে থাকে। আমরা মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বন্দুক যুদ্ধের কথা শুনছিলাম। অভিযানের সময় দুইপক্ষের মধ্যে বন্দুক যুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ী নিহত হওয়ার খবর পাচ্ছিলাম নিয়মিত। কিন্তু এই ব্যবসায়ীদের কতজন মহাজন তা নিয়ে সাধারণের প্রশ্ন ছিল,আছে। বাহ্যিকভাবে মনে হচ্ছিল- বহনকারীদের মোকাবিলা করে অভিযানের প্রথম ধাপ পার করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সাধারণ মানুষ অপেক্ষায় ছিল-এই ধাপ পেরোলেই মহাজনদের কাছে পৌঁছাতে পারবে। এরই মধ্যে নানাভাবে বিভিন্ন তালিকাও প্রকাশিত হচ্ছিল। সেখানে স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে পরিচিত গডফাদারদের নাম পাওয়া যায়। এক তালিকার সঙ্গে অন্য তালিকা মিলিয়েও নেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে খবর আসছিল কিছু ‘ভুলে’র। একরাম সেই ‘ভুলে’র বড় শিরোনাম হয়ে উঠলো।

একরাম বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে নানা রকম তথ্য থাকতে পারে। তিনবারের কাউন্সিলর। তার রাজনৈতিক পরিচয়ও আছে। টেকনাফের মতো জনপদে সেখানকার অন্যান্য স্থানীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার সম্পর্কের নানা সমীকরণ থাকতে পারে। এই সমীকরণের অঙ্কগুলো কতটা মিলিয়ে নেওয়া হয়েছিল, সেই প্রশ্ন উঠেছে এখন। যে অডিও প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে স্ত্রী ও কন্যার সঙ্গে একরামের কথোপকথন শোনা যায়, তার সত্যতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খতিয়ে দেখছে বলে দাবি করেছে। তদন্ত কমিটিও গঠিত হচ্ছে। রাষ্ট্র থেকে বলা হচ্ছে- ‘এমন বড় অভিযানে দুই-একটা ভুল হতেই পারে’। কিন্তু সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের কোনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এবং সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় পতিত দেখতে চায় না। বিশেষ করে যে অভিযান বা যুদ্ধের পক্ষে তাদের সায় বা সমর্থন আছে। তাই কোনও ভুলকেই প্রশ্রয় দেওয়ার পক্ষে নন সাধারণ জনগণ। তারা চান- যাকেই আইন বা বিচারের আওতায় আনা হোক না কেন, আগে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই বাছাই হোক। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও নির্মোহ অটুট থাকুক। রাজনৈতিক মতাদর্শ যাই হোক না কেন, কেউই শুনতে চায় না এমন কোনও আদ্র কণ্ঠ- ‘আব্বু, তুমি কান্না কারতেছো যে’।

লেখক: তুষার আবদুল্লাহ, বার্তা প্রধান, সময় টিভি

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

পূর্বের সংবাদ

December 2018
M T W T F S S
« Nov    
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

এই সপ্তাহের আলোকিত পাহাড় প্রথম পাতা

এই সপ্তাহের আলোকিত পাহাড় শেষ পাতা

বিজ্ঞাপন