খাগড়াছড়ি, , বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮

২৯ এপ্রিল পানছড়ি গণহত্যা দিবস; ৩২ বছর পরও বিচার পায়নি পার্বত্য বাঙ্গালীরা

প্রকাশ: ২০১৮-০৪-২৮ ২২:৩৯:৩১ || আপডেট: ২০১৮-০৪-২৮ ২২:৩৯:৩১

আলোকিত রিপোর্ট: ২৯শে এপ্রিল পানছড়ি গণহত্য দিবস। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন। ১৯৮৬ সালের এই দিনে পানছড়িতে বসবাসরত বাঙালির জীবনে নেমে আসে নৃশংস, বীভৎস, ভয়ঙ্কর ও বিভীষিকাময় এক কালরাত্রি। রাত আনুমানিক ৯টায় বর্বর শান্তি বাহিনী নিরস্ত্র নিরিহ শান্তিপ্রিয় বাঙালির ওপর হিংস্র দানবের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সেদিন পার্বত্যবাসী প্রত্যক্ষ করেছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের এক নৃশংস বর্বরতা। ঘটনার ৩২ বছর অতিবাহিত হলেও কোন বিচার পায়নি স্বজনহারানো পরিবার গুলো।

১৯৮৬ সালের ২৯শে এপ্রিল দিবাগত রাঁত আনুমানি ৯টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত মোট ৪ঘন্টা ব্যাপী খাগড়াছড়ি জেলার সীমান্তবর্তী পানছড়ি উপজেলা‘র ১নং লোগাং ইউনিয়ন, ৩নং পানছড়ি সদর ইউনিয়ন ও ৪নং লতিবান ইউনিয়ন (বর্তমানে ৫নং উল্টাছড়ি ইউপি)‘র বাঙ্গালি গ্রামে অগ্নি সংযোগসহ নির্বাচারে গণহত্যা চালায়। শিশু, কিশোর, নারী, পুরুষ, আবাল, বৃদ্ধ, বনিতা যাকে যেখানে পেয়েছে তাকে সেখানেই হত্যা করেছে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্রগ্রাম জন সংহতি সমিতি (জেএসএস)‘র অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। তৎ সময়ে বে-সরকারী হিসাবে মাত্র ৪ঘন্টা সময়ে নিরস্ত্র ও নিরীহ ৮শত ৫৩ জন বাঙ্গালীকে হত্যা করা হয়েছে, আহত করা হয়েছে প্রায় ৫শত জনকে, অপহরণ ও গুম করা হয়েছে আরো কয়েক হাজার বাঙ্গালীকে।

৬হাজার ২শত ৪০টি বাড়ি সম্পূর্ন ভাবে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এতে গৃহহীন হয়ে পড়ে হাজার হাজার পরিবার। সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন শান্তি বাহিনী‘র গেরিলা যোদ্ধারা সেই হামলায় এত গুলো মানুষকে হত্যা করতে একটি বুলেটও ব্যবহার করেনি। হাত-পা বেঁধে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে, দা দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে, জবাই করে, আগুনে পুড়িয়ে, শিশুদেরকে পায়ে ধরে গাছের সাথে বাড়ি দিয়ে, বেনেট ও অন্যান্য দেশি অস্ত্র দিয়ে খোঁচিয়ে খোঁচিয়ে হত্যা করেছিল। প্রতিটি লাশকেই বিকৃত করে সে দিন চরম অমানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল শান্তি বাহিনীর সন্ত্রাসীরা। ঘটনাটি যারা স্ব-চোখে খে দেখেছে বা বেচে যাওয়া কিছু কিছু সাক্ষী আজো আছে, কিন্তু ঘটনার কথা মনে পড়লে আজও তারা শিউরে উঠে।

পানছড়ি গণহত্যা ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে উপজাতি এসব সন্ত্রাসীদের দ্বারা বিভিন্ন গণহত্যা সংঘটিত হয়। এসব গণহত্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য লংগদু গণহত্যা, ১৯৭৯ কাউখালি গণহত্যা, বেতছড়ি গণহত্যা, বানরাইবারী, বেলতলী, বেলছড়ি গণহত্যা, তাইন্দং, আচালং, গৌরাঙ্গ পাড়া, দেওয়ান বাজার, তবলছড়ি, বর্ণাল, রামছিরা, গোমতি গণহত্যা,গোলকপতিমা ছড়া, মাইচ্যেছড়া, তারাবনছড়ি গণহত্যা, ভূষণছড়া গণহত্যা, দিঘীনালা গণহত্যা, ২৯ এপ্রিল ১৯৮৬, মাটিরাংগা গণহত্যা, কুমিল্লাটিলা, শুকনাছড়ি, দেওয়ান বাজার, সিংহপাড়া, তাইন্দং গণহত্যা, দিঘীনালা গণহত্যা, ২ জুলাই ১৯৮৬, ভাইবোন ছাড়া গণহত্যা, হিরাচর, শ্রাবটতলী, খাগড়াছড়ি, পাবলাখালী গনহত্যা, লংগদু গনহত্যা ১৯৮৯, নাইক্ষ্যাছড়ি গণহত্যা, মাল্যে গনহত্যা, লোগাং গনহত্যা, নানিয়ারচর গনহত্যা, পাকুয়াখালী গণহত্যা, জুরাইছড়ি গণহত্যা। জেএসএস’র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের রাংগামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান নিয়ে পৃথক রাষ্ট্র গঠন করা। সে ষড়যন্ত্র থেকে তারা হত্যা করে এদেশের খ্যাতিমান সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সিপাহী পর্যন্ত প্রায় ২৫৬ জন বীর সেনাকে।

পার্বত্য নাগরিক পরিষদের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আলকাছ আল মামুন ভূঁইয়া আলোকিত পাহাড়কে বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের ভূখন্ডে পার্বত্য বাঙ্গালীরা আজও অসহায় দিন যাপন করছে। শান্তিচুক্তির মাধ্যমে জেএসএস অস্ত্র জমা দিলেও পাহাড়ে তাদের শাখা- প্রশাখা গুলোর সশস্ত্র কার্যক্রম চলছে। তাদের হাতে প্রতিনিয়ত গুম, খুন অপহরণ, ধর্ষণ, চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছে বাঙ্গালীরা। দেশের স্বাধীনতা ও মানবতা বিরুধীদের মতো বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে, তাইন্দং, পানছড়ি গণহত্যাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩০ হাজার বাঙ্গালীর খুনি শান্তিবাহিনী তথা সন্তু লারমার বিচার করতে সরকারের প্রতি আহবান জানান তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস থেকে জানাযায়, শান্তি বাহিনী ছিল তিন পার্বত্য জেলা সমূহে অবস্থানকারী উপজাতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী বাহিনী। এরা পার্বত্য এলাকার সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি অপহরন, ইত্যাদি অপকর্মে লিপ্ত ছিল। তাদের অত্যাচার নির্যাতন ও নিপিড়ন থেকে সাধারণ জনগণকে রক্ষার জন্য সরকার সেসময় পার্বত্য এলাকায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করে। ১৯৯৭ সালের ২ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি জেএসএস) আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। শান্তিবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির একটি সশস্ত্র অঙ্গ সংগঠন। ১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারি শান্তিবাহিনী প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল।

উল্লেখ্য, ১৯৬০ সালে কাপ্তাই হাইড্রো-ইলেকট্রিক প্রজেক্ট বাস্তবায়নের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ি জনগণের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। ওই অসন্তোষেরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ ঘটে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িরা নিজেদের জুমিয়া জাতি হিসেবে ঘোষণা দেয় এবং বাংলাদেশ সরকারের নিকট থেকে এর স্বীকৃতি দাবি করে। স্বীকৃতিলাভে ব্যর্থ হয়ে জুমিয়া জাতি আত্মনিয়ন্ত্রনের অধিকার অর্জনের লক্ষ্যে ৪ দফা দাবিনামা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের নিকট পেশ করে। (ক) নিজস্ব আইন পরিষদসহ পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ঘোষণা করা; (খ) ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম অধ্যাদেশের অনুরূপ সংবিধি বাংলাদেশের সংবিধানে বিধিবদ্ধ করা; (গ) উপজাতীয় রাজাদের দপ্তর সংরক্ষণ করা; এবং (ঘ) সংবিধানে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসন সংরক্ষিত রাখার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা।

কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে শান্তিবাহিনী তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাকে উত্তর ও দক্ষিণ দুটি সামরিক অঞ্চলে বিভক্ত করে। প্রতিটি অঞ্চলকে আবার ৩টি সেক্টরে এবং সেক্টরগুলোকে বিভিন্ন এলাকায় ভাগ করা হয়। জনসংহতি সমিতি ও শান্তিবাহিনীর সদর দপ্তর ছিল খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার দুর্গম অরণ্যে।

১৯৭৪ সাল নাগাদ বিপুল সংখ্যক পাহাড়িদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে শান্তিবাহিনীতে অর্ন্তভুক্ত করা হয়। নিয়মিত বাহিনী ছাড়াও সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ প্রাপ্তদের নিয়ে মিলিশিয়া বাহিনী গঠিত হয়। শান্তিবাহিনী ও মিলিশিয়া বাহিনীকে সহায়তার লক্ষ্যে গ্রাম পঞ্চায়েত এবং বহুসংখ্যক যুব সমিতি ও মহিলা সমিতি গড়ে তোলা হয়। সামগ্রিক প্রস্তুতি গ্রহণ শেষে শান্তিবাহিনী ১৯৭৬ সালের প্রথমদিকে সশস্ত্র তৎপরতা শুরু করে। শান্তিবাহিনী পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী বাঙালিদের আক্রমণ ও হত্যা, নিরাপত্তা বাহিনীকে আক্রমণ, তাদের মতাদর্শ বিরোধী উপজাতীয়দের হত্যা, সরকারি সম্পদের ক্ষতিসাধন, অপহরণ ও বলপূর্বক চাঁদা আদায়সহ বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ জোরদার করে।

১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর অন্তর্দলীয় কোন্দলে নিহত হবার পূর্ব পর্যন্ত মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা জনসংহতি সমিতি ও শান্তিবাহিনীর নেতৃত্ব দেন। মানবেন্দ্র লারমার হত্যাকান্ডের পর শান্তিবাহিনী দ্বিধাবিভক্ত হয়ে (লারমা ও প্রীতি গ্রুপ) আত্মঘাতি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। বাংলাদেশ সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা দিয়ে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য শান্তিবাহিনীর সদস্যদের পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় এবং তাদের প্রতি অস্ত্র সমর্পণ ও বিদ্রোহ সংঘাত বন্ধ করার আহবান জানায়। প্রীতি গ্রুপের অধিকাংশ নেতা-কর্মী ১৯৮৫ সালের ২৯ এপ্রিল আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু লারমা গ্রুপ নাশকতামূলক কর্মকান্ড অব্যাহত রাখে।

১৯৮৫ সালে শান্তিবাহিনীর ফিল্ড কমান্ডার বোধিপ্রিয় লারমা জনসংহতি সমিতির সভাপতি নিযুক্ত হন। এরপর বিভিন্ন সময়ে সরকার ও শান্তিবাহিনীর মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ গৃহীত হয়। ১৯৯১-৯৬ মেয়াদের জন্য নির্বাচিত সরকার পূর্ববর্তী সকল সরকারের নেয়া শান্তি প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখেন। অবশেষে পরবর্তী মেয়াদে (১৯৯৬-৯৭) নির্বাচিত আওয়ামীলীগ সরকার ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে। এরপর ১৯৯৯ সালে জনসংহতি সমিতির ষষ্ঠ মহা-সম্মেলনে শান্তিবাহিনীর আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

পূর্বের সংবাদ

November 2018
M T W T F S S
« Oct    
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930  

এই সপ্তাহের আলোকিত পাহাড় প্রথম পাতা

এই সপ্তাহের আলোকিত পাহাড় শেষ পাতা

বিজ্ঞাপন

error: Content is protected !!