খাগড়াছড়ি, , মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯

সোনার বাংলা বির্ণিমানে, পার্বত্য জেলা পরিষদের ভূমিকা- খগেশ্বর ত্রিপুরা

প্রকাশ: ২০১৯-০৯-০৪ ১৯:১৭:৪১ || আপডেট: ২০১৯-০৯-০৪ ১৯:১৭:৪৭

১৯৭১ ইং সনে বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে জন্মলাভ করে। এই স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গাঁলী বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পৃথিবীর ইতিহাসে অতি অল্প সময় মাত্র ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করেছেন তা ইতিহাসে বিরল। স্বাধীনতা অর্জনের ৫০ দিনের মাথায় স্বাধীনতা যুদ্ধে বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের বিশাল সেনা-বাহিনীকে ১৯৭২ ইং সনে ১২ মার্চ তারিখ হতে এদেশ থেকে প্রত্যাহার কার্যক্রম শুরু করে বঙ্গঁবন্ধু বিশ্ববাসীকে চমক দেখিয়েছেন। বঙ্গঁবন্ধু বেঁচে থাকলে এত বছরে এদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্ত করে সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করে বিশ্ববাসীকে আরো অনেক চমক দেখাতে সক্ষম হতেন। কিন্তু বিধিবাম স্বাধীনতা অর্জনের অল্পসময়ের মধ্যে ১৯৭৫ইং সনের ১৫ আগষ্ট কালরাত্রিতে স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের কবলে পরে কিছু বিপদগামী লোক নৃশংসভাবে বঙ্গঁবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করে। কিন্তু তারা বঙ্গঁবন্ধুকে হত্যা করতে পারলেও বঙ্গঁবন্ধুর আর্দশ, বঙ্গঁবন্ধুর রাজনীতি ও বঙ্গঁবন্ধুর স্বপ্নকে হত্যা করতে পারেনি, যার জন্য বঙ্গঁবন্ধুর রাজনৈতিক বিচক্ষনতা, তাঁর স্বপ্ন বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ততদিন থাকবে। বঙ্গঁবন্ধু বিশ্বাস করেন ‘‘স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন কাজ’’ এবং এই কঠিন কাজ সুষ্ঠ সম্পাদন করতে হলে অর্থনৈতিক মুক্তির প্রয়োজন। এই অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করতে হলে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে এবং ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারলেই বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় রূপান্তর করা সম্ভব। বঙ্গঁবন্ধু রাজনৈতিক বিচক্ষনতা দেখে তৎকালীন বিশ্বের অনেক বরেণ্য রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্র নায়কেরা ভূ-য়সী প্রশংসা করে তাদেঁর অনুভূতি প্রকাশ করেছিলেন। কিউবার অবিসংবাদিত রাষ্ট্র নায়ক প্রেসিডেন্ট ফিডেল কাস্ট্রো গর্বের সাথে বলেছিলেন ‘‘আমি হিমালয় দেখিনি কিন্তু বঙ্গঁবন্ধুকে দেখেছি’’। তাঁর এই কথার মমার্থ হচ্ছে তিনি পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃংঙ্গ হিমালয় পর্বত না দেখলেও পৃথিবীর শীর্ষ ব্যক্তিকে দেখেছেন। তৎকালীন বিশ্বের আরও অনেক রাষ্ট্রনায়ক ও রাজনীতিবিদগন ফিদেল কাস্ট্রোর এই বক্তব্যের প্রতি নানা ভাবে সমর্থন জানিয়েছেন। স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭২ইং সনে প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিডক্রস্ট বঙ্গঁবন্ধুকে ২টি প্রশ্ন করেছিলেন:
১. আপনার শক্তি কোথায়?
২. আপনার দুর্বলতা কোথায়?
উত্তরে বঙ্গঁবন্ধু বলেছিলেন: ১.আমার শক্তি আমি আমার জনগনকে ভালোবাসি। ২. আমার দুর্বলতা আমি আমার জনগনকে খুববেশী ভালোবাসি। বঙ্গঁবন্ধু এদেশের জনগনকে ‘‘ভালোবাসা’’ এবং ‘‘খুববেশী ভালোবাসা’’ হচ্ছে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন এবং রাজনৈতিক শক্তি। দর্শনের উপজীব্য বিষয় যেমন ‘‘জগৎ ও জীবন’’ অর্থাৎ জগৎ ও জীবনকে নিয়ে যেমন দর্শনের সৃষ্টি এবং দর্শন আবর্তিত, ঠিক তেমনি বঙ্গঁবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন হচ্ছে ‘‘বাংলাদেশের জনগন ও বাংলাদেশের জনগনের মুক্তি’’। বঙ্গঁবন্ধুকে হত্যা করার পর তাঁর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব অনেক চড়াই উতরায় পেরিয়ে আসার প্রায় ২১ বছর পর ১৯৯৬ইং সনে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তাঁর পিতা বঙ্গঁবন্ধুর ন্যায় জননেত্রী শেখ হাসিনাও এদেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য গভীর ভাবে চিন্তা করেন। তিনি তাঁর পিতার যোগ্য উত্তরসুরী হিসাবে বঙ্গঁবন্ধুর স্বপ্ন ‘‘সোনার বাংলা’’ রূপান্তর করার কথা সর্বাগ্রে বিবেচনায় রাখেন। আর এই সোনার বাংলা রূপান্তর হলে দেশের সকল অংশকে ক্ষুধা ও দরিদ্রমুক্ত করতে হবে। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন তাঁর পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সংখ্যালঘু অনগ্রসর ও পশ্চাৎপদ সমাজের বিকশিত করতে হবে এবং তাদের বিকশিত ব্যতিরেকে এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা মোটেই সম্ভব নহে। তিনি ইহাও বিশ্বাস করতেন ‘‘শান্তি উন্নয়নের পূর্বশর্ত’’ শান্তি স্থাপনছাড়া কোন এলাকায় উন্নয়ন সাধন করা সম্ভব নহে। তাই জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহনের সঙ্গে সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে রাজনৈতিক ভাবে সমাধানের লক্ষ্যে উদ্যোগ গ্রহন করেন। অথচ তাঁর আগের অনেক সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে রাজনৈতিক সমস্যা হিসাবে না দেখে অন্যভাবে সমাধান করতে চেয়েছিল। যার জন্য তাদের পক্ষে সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হয়নি। অনেক রাজনীতিবিদ ও অভিজ্ঞ মহলের মতে জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকার ব্যতীত অন্য সব সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে রাজনৈতিক সমস্যা হিসাবে হয়ত: চিহ্নিত করতে পারেনি, না হয় ইচ্ছা করে চিহ্নিত করেনি। তাই তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে লোক দেখানোর দায়সারা মনোভাব নিয়ে প্রক্রিয়া দেখিয়েছেন মাত্র। যা আমরা রক্ত দোষের মধ্যে মলম মালিশ করে সাময়িক উপশম করার প্রক্রিয়ার সামিল হিসাবে গণ্য করতে পারি। কিন্তু জননেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা গ্রহনের সাথে সাথে রাজনৈতিক সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করে এখানকার সমস্যা রাজনৈতিক ভাবে সমাধানের জন্য উদ্যোগ গ্রহন করেন। তাঁর এই উদ্যোগের অংশ হিসাবে তিনি মহান জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ আবুল হোসেন আব্দুল্লাহ্ কে প্রধান করে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করেন এবং সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতির মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে সংলাপের ব্যবস্থা করার লক্ষ্যে খাগড়াছড়ি সদরের সাবেক চেয়ারম্যান বর্ষীয়ান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হংস ধ্বজ চাকমাকে আহবায়ক এবং পানছড়ি সদর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও খাগড়াছড়ি স্থানীয় সরকার পরিষদ সদস্য মো: শফি ও রাঙ্গামাটির বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মথুরা লাল চাকমাকে সদস্য করে ৩ (তিন) সদস্য বিশিষ্ট্য ‘‘পার্বত্য চট্টগ্রাম যোগাযোগ কমিটি’’ গঠন করেন। এই যোগাযোগ কমিটির অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এবং জনসংহতি সমিতি ও সরকারের সদিচ্ছায় অতি অল্প সময়ের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এই সংলাপ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা ব্যতিরেকে জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং জনসংহতি সমিতির সদিচ্ছায় ২রা ডিসেম্বর ১৯৯৭ইং সনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পাদিত হয়। সরকারের পক্ষে স্বাক্ষর করেন জাতীয় কমিটির আহবায়ক মহান জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ আবুল হোসেন আব্দুলাহ্ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসাধারনের পক্ষে স্বাক্ষর করেন জনসংহতি সমিতির সভাপতি বর্তমান আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান শ্রী জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় সন্তু লারমা। এই চুক্তি সম্পাদনের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশে বিদেশে যেমনি উচ্চ প্রসংশিত হয়েছেন, তেমনি অনেক পুরষ্কারে ভূষিত হওয়ার পাশাপাশি ইউনেস্কোর মতো আর্ন্তজাতিক পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন।

১৯৯৬ ইং সনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর ২০০৮ ইং সনে ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ পুনরায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় এবং জননেত্রী শেখ হাসিনা দ্বিতীয় দফা প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। দ্বিতীয় দফা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশকে নিন্মমধ্যম আয়ের দেশ হিসাবে গড়ার জন্য পরিকল্পনা করেন। ২০২১ সালের রূপকল্পকে সামনে রেখে দেশ পরিচালনা করে বাংলাদেশকে অনেকদূর সামনে এগিয়ে নিতে সক্ষম হন এবং এই সক্ষমতার কারনে দশম সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ নিরঙ্কুশ আসনে জয়লাভ করে তৃতীয় বারের মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিষ্ঠিত হয় এবং জননেত্রী শেখ হাসিনা ৩য় বারের ন্যায় প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ঘোষনা হলো ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসাবে গড়ে তোলা। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ নিন্ম মধ্যম আয়ের দেশে পরিনত হয়েছে। একই সাথে জননেত্রী শেখ হাসিনা আরও একটি ভিশন হলো তিন পার্বত্য জেলাকে আরও অধিক গতিশীল করে এখানকার মানুষকে ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্ত করে সোনার বাংলার সাথে সোনার পার্বত্য জেলা গড়ে তোলা। কারন কোন একটি মানব দেহকে সম্পূর্ন সুস্থ রাখার জন্যে যেমনি তার শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সুস্থ রাখা প্রয়োজন, তেমনি কোন একটি দেশকে কোন বিশেষ লক্ষ্যে পৌছাঁতে হলে সেই দেশের সমগ্র অঞ্চল ও সমগ্র জনগোষ্ঠী এবং জনগনকে নিয়ে সেই লক্ষ্যে পৌছাঁতে হবে। কোন একটি অঞ্চল কিংবা কোন জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে বিশেষ কোন লক্ষ্যস্থানে পৌঁছা কোন ভাবে সম্ভব নয়। তেমনি বঙ্গঁবন্ধুর ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলা জননেত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ ২০২১ সালের নিন্মমাধ্যম আয়ের দেশ ২০৪১ সালের মধ্যম আয়ের দেশ গড়া কোন ক্রমেই সম্ভব নয়। তাই সরকারের এই ভিশনকে বাস্তবায়নের অংশ হিসাবে তিন পার্বত্য জেলার পশ্চাৎপদ ও অনগ্রসর অংশের মানুষকে এখানকার বাস্তব অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে। যেহেতু তিন পার্বত্য জেলার তিনটি পৃথক পার্বত্য জেলা পরিষদ এখানকার মানুষের উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু এবং সরকার বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করে এখানকার অনগ্রসর ও পশ্চাৎপদ অংশের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বিশেষ ব্যবস্থার অংশ হিসাবে পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের মাধ্যমে এখানকার মানুষের উন্নয়নের জন্য জননেত্রী শেখ হাসিনা বিশেষ উদ্যোগ গ্রহন করে। এই উদ্যোগের অংশ হিসাবে তিনি প্রথমে অর্ন্তবতীকালীন তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকে ৫ সদস্য হতে ১৫ সদস্যে কালবর বৃদ্ধি করেন। দর্শনের মূল উপজীব্য বিষয় ‘‘জীবন ও জগৎ’’ এবং যুক্তি ও সুক্ষè বিচার বিশ্লেষন, তেমনি কাব্য সাহিত্যের উপজীব্য বিষয় হলো হৃদয়ের অনুভূতি আবেগ, আপ্লুত। মাস্তিস্ক যেমন দর্শনের বাহন তেমনি হৃদয় হলো কাব্য সাহিত্যের বাহন। কিন্তু মস্তিক ও হৃদয়ের সেই দুটি বাহন একত্রিত করতে না পারলে কোনদিন দর্শন ও সাহিত্যের পূর্ণতা হয় না। কারন দর্শনের পথ যুক্তির পথ হলেও সেই যুক্তিকে হৃদয়াঙ্গঁম করার জন্য প্রয়োজন হৃদয়ের অনুভূতি ও আবেগ। তাই দর্শনকে হৃদয় দিয়ে অনুভূতির জন্য প্রয়োজন সাহিত্য এবং সাহিত্যকে যুক্তি সম্মত করার জন্য দরকার মস্তিস্ক বা দর্শন। যুক্তি ও অনুভূতি দুইটি পক্ষ পারস্পরিক সহায়কের ভূমিকা নিয়ে একত্রিত হয়ে সাহিত্যকে যেমনি সু-সাহিত্যের পরিনত করে, তেমনি দর্শনকেও অত্যন্ত জনপ্রিয় ও যুক্তিবাদী করে তোলে। তখনই কিন্তু কবি সাহিত্যিক প্রকৃত কবি সাহিত্যিক এবং দার্শনিক প্রকৃত দার্শনিক হিসাবে মর্যদা লাভ করে। এখানে বঙ্গঁবন্ধুর ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন, জননেত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ, নিন্মমধ্যম আয়ের দেশ ও মধ্যম আয়ের দেশ হিসাবে গড়ে তোলার প্রত্যয়ের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের কার্যক্রম এবং তিন পার্বত্য জেলার অনগ্রসর ও পশ্চাৎপদ জনগনের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পরিকল্পনা দর্শন ও সাহিত্যের উপজীব্য বিষয়ের পারস্পরিক সর্ম্পকের ন্যায় ওতপ্রোত ভাবে সর্ম্পকিত। কারন দর্শনকে বাদ দিয়ে যেমনি সাহিত্য পূর্ণতা হয়না, তেমনি সাহিত্যকে বাদ দিয়ে দর্শন যুক্তিবাদী ও জনপ্রিয়তা অর্জন করা যায় না। অনুরূপ বঙ্গঁবন্ধুর স্বপ্ন ও জননেত্রী শেখ হাসিনার অঙ্গীঁকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন ব্যতীত যেমনি তিন পার্বত্য জেলার মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন হবে না; তেমনি তিন পার্বত্য জেলার ভাগ্য উন্নয়ন ব্যতীত বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তোলা এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার অঙ্গীঁকার বা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। সাহিত্য ও দর্শন পারস্পরিক সর্ম্পক যুক্ত হয়ে যেমনি উভয়েই ইতিবাচক পূর্ণতা অর্জন করে তেমনি বঙ্গঁবন্ধুর সোনার বাংলা ও জননেত্রী শেখ হাসিনার অঙ্গীঁকার বা পারিকল্পনার সাথে তিন পার্বত্য জেলার উন্নয়ন ও অগ্রগতির সাধনসহ পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন এর ক্ষেত্রে একমাত্র ইতিবাচক পূর্ণতা অর্জন করা সম্ভব। জননেত্রী শেখ হাসিনা সেই ইতিবাচক পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়েই অর্ন্তবতীকালীন তিন পার্বত্য জেলার পৃথক তিনটি অর্ন্তবতীকালীন পরিষদের কালেবর বৃদ্ধি করেছেন পাঁচ সদস্য হতে পনের সদস্য বিশিষ্ট করার মাধ্যমে। জননেত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বাস করতেন পাঁচ সদস্যের স্থানে যদি পনের সদস্য করে অর্ন্তবতীকালীন পৃথক তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন করে পরিষদের কার্যক্রম সুষ্ঠভাবে সম্পাদন করলে যেমনি গতিশীলতা আসবে, তেমনি এখানকার অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি সত্ত্বা সমূহের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং ভবিষ্যতে অনগ্রসর ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী হতে নেতৃত্ব সৃষ্টির মাধ্যমে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, দেশ ও জাতির কল্যানের ক্ষেত্রে অগ্রনী ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে। বাস্তব সত্য যে- যে সমাজে, যে দেশে যতবেশী নেতা ও নেতৃত্ব আছে এবং তৈরী হয় সেই দেশ, সেই সমাজ ততবেশী সমৃদ্ধশালী। তাই জননেত্রী শেখ হাসিনা এই বাস্তবতাকে অনুধাবন করে যেমনি পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন করেছিলেন তেমনি এই চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এখানকার মানুষের সার্বিক ক্ষেত্রে উন্নয়ন সাধন করতে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহন করেন। এক কথায় বলা যায়, জননেত্রী শেখ হাসিনা তিন পার্বত্য জেলাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেন যে স্বপ্ন এ অঞ্চলের মানুষের কৃষ্টি সংস্কৃতি জাতীয় সংস্কৃতির মূল স্রোত ধারায় বিকশিত করা। সুতরাং জননেত্রী শেখ হাসিনার এই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার জন্য জনগনের কল্যানের প্রতি গুরুত্বারোপ করে পার্বত্য জেলা পরিষদকে কাজ করতে হবে। যেমনি তৈলকে নিঃশেষ করে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে, বৃক্ষ যেমন প্রস্ফুটিত হয়ে সুগন্ধি ছড়ায় তেমনি পার্বত্য জেলার অনগ্রসর ও পশ্চাৎপদ মানুষের কল্যান ও মঙ্গলের জন্য পার্বত্য জেলা পরিষদকে কাজ করা প্রয়োজন। তজ্জন্য পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা-বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। পরিষদে যারা নীতি নির্ধারক তাদের এমন কোন আচরণ করা যাবে না, যা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যক্তি, শ্রেনী ও জাতিসত্ত্বা পর্যায়ে বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে। সংকীর্ণতাবোধ পরিহার করে পরিষদের কার্যাবলী গণমুখী করা এবং ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে পরিষদের বিধান ও পরিধি অনুসারে কার্যক্রম পরিচালনা, সিদ্ধান্ত গ্রহন, বাজেট উপস্থাপন, সভা অনুষ্ঠান, উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা ও বাস্তবায়নসহ সকল ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে খোলামেলা আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে কাজ করতে হবে। রুটিন কাজ এবং চেয়ারম্যান, সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সুনির্দিষ্ট এখতিয়ারভূক্ত কাজ ব্যতীত একক সিন্ধান্ত বা কারো খেয়াল খুশিমতে যেন কোন কাজ না হয়, সেই দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এছাড়া সৃজনশীল, গণমুখী এবং বেকার সমস্যা দূরীকরণের জন্য কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্যোগ গ্রহন ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে, যা কাঙ্খিত লক্ষ্য পূরণ করে মানুষের উপকার হয়। মনে রাখতে হবে যে, জননেত্রী শেখ হাসিনা পার্বত্য এলাকার পশ্চাৎপদ ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সার্বিক কল্যান সাধনের জন্য ৫ সদস্য হতে ১৫ সদস্য কলেবর বৃদ্ধি করেছেন, তাই পরিষদের সকল কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যেন গুরুত্বের সহিত বিবেচনা করে বাস্তবায়ন হয় এবং এই বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াতে সকল সদস্য এবং সকল জন-গোষ্ঠীর মধ্যে যেন বৈষম্য সৃষ্টি না হয়, সেই দিকে সর্বদা সজাগ থাকতে হবে। প্রেমের চম্বুকের ন্যায় জড় পরমানু রাশি যেমন পারস্পরের প্রতি আকর্ষন হয়, তেমনি পরিষদের কার্যক্রম বাস্তবায়নের সময় পারিষদ বর্গের মধ্যে পারস্পরিক আকর্ষন থাকতে হবে। ভারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্বমতে ‘‘জগতে সব কিছুই প্রবাহমান ও পরিবর্তনশীল এবং এই পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিবর্তিত বর্তমান অবস্থা হচেছ পূর্ববর্তী অবস্থার ক্রম বিকাশের ফল’’। কবিগুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের মতে ‘‘ধর্ম মানেই মনুষ্যত্ব। যেমন আগুনের ধর্ম অগ্নিত্ব, পশুর ধর্ম পশুত্ব, তেমনি মানুষের ধর্র্ম মানুষের পরিপূর্ণতা; তাই মানুষের জন্য ধর্ম; ধর্মের জন্য মানুষ নয়’’।

এখানে ভারউইনের বিবর্তনবাদ এবং কবিগুরুর বক্তব্যের সাথে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের কার্যক্রম বিষয়ে তুলনামূলক পর্যালোচনা করা যায়। ভারউইনের মতবাদ বর্তমান অবস্থা পূর্ববর্তী অবস্থার ক্রম বিকাশের ফল। এক্ষেত্রে পার্বত্য জেলা পরিষদের পারিষদবর্গ যদি ইতিবাচক কার্যাবলী সম্পাদন করে, তাহলে এখানকার মানুষের ইতিবাচক পরিবর্তন হবে, আর যদি নেতিবাচক কার্যাবলী সম্পাদন করে তবে নেতিবাচক ফল সৃষ্টি হবে। অপরদিকে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উক্তিমতে বলতে পারি যে, পার্বত্য জেলা পরিষদ-ই পার্বত্য চুক্তি, পার্বত্য চুক্তি-ই জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন, জননেত্রী শেখ হাসিনা স্বপ্নই পার্বত্য জেলা পরিষদের কার্যক্রমের ইতিবাচক বাস্তবায়ন এবং ইতিবাচক বাস্তবায়নের মাধ্যমে এখানকার পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীকে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত করে সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসাবে অবদান রাখবে। রবীন্দ্রনাথের উক্তি ‘‘যেমনি মানুষের জন্যে ধর্ম, ধর্মের জন্যেই মানুষ নয়’’ তেমনি ‘‘পার্বত্য বাসীদের জন্যই পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য জেলা পরিষদের জন্যই পার্বত্যবাসী নয়’’। অপরদিকে তারমতে মানুষের ধর্ম মানুষের পরিপূর্ণতা, তেমনি পার্বত্য জেলা পরিষদের ইতিবাচক কার্যাবলী সম্পাদনের মধ্যেই পার্বত্য জেলা পরিষদের পরিপূর্ণতা। বষ্কিমচন্দ্র চট্টোপধ্যায় এর মতে ‘‘ধর্ম বলি আর দর্শন বলি প্রত্যেকটিরই লক্ষ্য ব্যক্তির সুখ সাধন। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হয় কর্ম দিয়ে, ধ্যান-অনুধ্যান দিয়ে নয়। কিন্তু কোন কর্ম যথোচিত এবং কোন কর্ম অনুচিত তা নির্নয় করার জন্যে থাকা চাই সুনির্দ্দিষ্ট নৈতিক মানদন্ড। বষ্কিমের মতে- এই মানদন্ড হলো ‘‘ইউটিলিটি’’ বা উপযোগীতা যাকে তিনি ‘হিত’ হিসাবে হিতবাদের অবলম্বনে রচনা করেছেন ‘‘কর্মবাদী জীবন দর্শন’’।

বষ্কিমচন্দ্রের কর্মবাদী জীবন দর্শনের মতে: কোন একজন ব্যক্তির যে পরিমান হিত সাধন করতে পারে, সেই হিত দিয়ে শতজনের প্রত্যেকের এক চর্তুথাংশ হিত সাধিত হতে পারে। এ স্থলে একজনের হিত হবে ১০০ এবং শতজনের হিত হবে = ২৫। এক্ষেত্রে ১ জনের হিত ১০০ হলেও সেই ১০০ হিত বাস্তবায়ন না করে ১০০ জনের জন্য ২৫ হিত টি বাস্তবায়ন বা সাধন করাই হচ্ছে বেশী ধর্ম। বষ্কিম চন্দ্রের এই হিত তত্ত্বের সূত্রমতে যদি প্রত্যেকটি কর্ম সম্পাদন করা যায় তবে তিন পার্বত্য জেলাকে নিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তুলনামূলক ভাবে অতি কম সময়ের মধ্যে কাঙ্খিত সুফল অর্জন করা সম্ভব হবে।

শেষকথা, বঙ্গঁবন্ধু সোনার বাংলা, জননেত্রী শেখ হাসিনার ২০২১ সালের রূপকল্প, ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে সেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এখানকার মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী মাইল ফলক হিসাবে স্মরনীয় হয়ে থাকবে।

লেখক- খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ সদস্য শিক্ষানুরাগী খগেশ্বর ত্রিপুরা।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

পূর্বের সংবাদ

November 2019
M T W T F S S
« Oct    
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

এই সপ্তাহের আলোকিত পাহাড় শেষ পাতা

বিজ্ঞাপন