খাগড়াছড়ি, , বুধবার, ২৩ জানুয়ারী ২০১৯

সাইরু ম্রোর অমর প্রেম কাহিনী ‘বন্ধু ছাড়া বাঁচি কি করে’

প্রকাশ: ২০১৮-০৩-১৮ ১২:৫৫:৩৯ || আপডেট: ২০১৮-০৩-১৮ ১২:৫৫:৩৯

মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, বান্দরবান: প্রেমিক হারানোর বিরহে পাহাড় চুড়ো থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মাহুতি দেওয়া ম্রো তরুণী ‘সাইরু’। তাঁর অমর প্রেমের সাক্ষী হয়ে আলিঙ্গনরত অবস্থায় পাহাড় চূড়োয় দাঁড়িয়ে আছে দুটি বনবৃক্ষ। একটি ফুলসুমারি অন্যটি ধারমারা গাছ। বান্দরবানের চিম্বুক রোডের সেই এলাকার নাম এখন ‘সাইরু পয়েন্ট’।

“ধনী এবং সম্পদশালী হওয়ায় সাইরু এবং তার প্রেমিকের পরিবার স্থানীয়ভাবে ‘রাজ পরিবার’ নামে পরিচিত ছিল। প্রথমদিকে দুই পরিবারের লোকজন এই প্রেমকে বাধা দিতেন না। ফলে দিনে দিনে এই প্রেম অনেক গভীরে পৌঁছায়। কিন্তু প্রেমে বাধা না দিলেও জাতি ভিন্ন হওয়ায় দু’পরিবারের আত্মীয়-স্বজনরা তাদের মধ্যে বিয়ে মেনে নিতে পারেননি।

তাঁদের মধ্যকার প্রেম এতটাই প্রবল ছিল, একজন আরেকজনকে ছাড়া থাকতে পারতেন না। তাই প্রতিরাতে সাইরু তাদের জুম পাহাড়ে গোপনে মিলিত হতেন। কিন্তু হঠাৎ করে যেন সব উলট-পালট হয়ে গেল। সাইরুর প্রেমিক যুবক আর দেখা করতে আসেন না। একা একা পাহাড়ের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হেঁটে হেঁটে বিরহের গান গেয়ে পরদিন ভোরে ভাঙা মন নিয়ে বাড়ি ফিরতেন সাইরু।

একদিন সাইরু খবর পেলেন, মা-বাবার চাপে পড়ে তার প্রেমিক যুবক নিজ জাতির একজনকে বিয়ে করে সুখী জীবন কাটাচ্ছেন। এই সংবাদে সাইরু কিংকর্তব্য বিমূঢ হয়ে পড়ে। সুখের ঘর বাঁধার স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়ে যায়।

সাইরু ভাবেন, ‘বন্ধু ছাড়া বাঁচি কি করে?’ এভাবে কেটে যায় দিন রাত। সাইরুর কান্নায় গাছের পাতারা ঝরে যায়। পাখির গান বন্ধ হয়ে যায়। বাতাস স্তব্ধ হয়ে পড়ে। একরাতে জুম পাহাড়ে এসে আগের জায়গায় বসে অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করে সাইরু। অনেক দূর থেকেও গ্রামবাসী তাঁর কান্নার শব্দ শোনে। এরপর ভোরের দিকে পাহাড় চূড়া থেকে গভীর খাদে ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দেন সাইরু।

এদিকে অনেকদিন সাইরুর কোনো খোঁজ না পেয়ে গ্রামবাসী জুম পাহাড়ে এসে দেখেন সেখানে সাইরু নেই। তাঁদের মিলনের স্থানটিতে আলিঙ্গন করে দাঁড়িয়ে আছে একটি ফুলসুমারি গাছ এবং আরেকটি ধারমারা গাছ। এখনও ম্রো জনগোষ্ঠী বিশ্বাস করে, সাইরুর মৃত্যু হয়নি। জগেজাড়া প্রেমিক প্রেমিকার জন্যে অনুপ্রেরণা হয়ে সাইরুর আত্মা ঘুরে বেড়াচ্ছে।

সাইরুর আত্মাহুতি দেওয়া বান্দরবানের চিম্বুক রোডের সেই জুম পাহাড় এখন ‘সাইরু হিল রিসোর্ট’ নামে পরিচিত। বিত্তবান বন্ধুদের সহায়তায় মৌজা হেডম্যান রাংলাই ম্রো বছর তিনেক আগে এ রিসোর্ট গড়ে তোলেন।

বর্তমানে বান্দরবানের পর্যটনের মুকুটে নতুন স্থান করে নিয়েছে সাইরু রিসোর্ট। অন্য সব পর্যটন স্পটকে ছাড়িয়ে তা এখন দেশ বিদেশের অতিথিদের কাছে আকর্ষনীয় স্থান হিসেবে বেশ পরিচিতি লাভ করেছে। বান্দরবানে ঘুরতে এলে থানচি সড়কের নজরকাড়া এই অবকাশযাপনের কেন্দ্রে ঢুঁ মারতে একটুও ভুল করেননা ভ্রমন পিপাষু মানুষ।

বান্দরবান জেলা সদর থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই অবকাশ কেন্দ্রের বিনিয়োগকারীরা যথেষ্ট রুচিশীল। সাইরুর এই প্রেম কাহিনিকে মর্যাদা দিতে গাছের গোড়ায় গোলাকৃতির শান বাঁধিয়ে তারা স্থানটিকে একটি চমৎকার দর্শনীয় স্থানে রূপ দিয়েছে।
উদ্যোক্তা ও মৌজা হেডম্যান রাংলাই জানান, ম্রো ভাষায় ‘সাই’ অর্থ ‘পবিত্র’ এবং ‘রু’ অর্থ ‘আত্মা।’ সাইরুর এই প্রেম কাহিনিকে বাঁচিয়ে রাখতে রিসোর্টের নাম দেয়া হয়েছে ‘সাইরু।’ ট্র্যাজিক প্রেমের কাহিনী অমর করে রাখতে আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।

সাইরুর সেই প্রেম কাহিনী ম্রো যুবক-যুবতীদের মুখে মুখে। এখনো নিজের প্রেমের গভীরতা বোঝাতে তাঁরা বলেন, সাইরুর মতই আমি তোমাকে ভালোবাসি। কেউ বলছেন, সাইরুর আত্মাহুতির কথা জানতে পেরে প্রেমিক যুবকও একই পাহাড় চূড়ো থেকে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। কেউ বলে পাগল বেশে অনেক দিন ঘুরে ঘুরে সেই যুবকও একদিন কোথায় যেন হারিয়ে গেছেন।

এই রিসোর্টের প্ল্যানার, আর্কিটেক্ট এবং প্রকৌশলী ওয়াহিদুজ্জামান জানান, সাইরুর অমর প্রেমের কাহিনিকে বাঁচিয়ে রাখতে এক পাশে গভীর খাদ, যেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন সাইরু, অন্যপাশে আলিঙ্গনরত দুটি বিশাল বৃক্ষকে অবিকৃত রেখে এই গোলাকার প্ল্যাটফরমটি নির্মাণ করা হয়েছে।

তিনি জানান, যাঁরাই সাইরু রিসোর্টে অতিথি হয়ে আসেন, তাঁরা সবাই প্রতিদিনই একবার হলেও এখানে এসে বসেন। পুরো প্রকল্প এলাকার মধ্যে এটিই যেন সবচেয়ে প্রিয় স্থান। ‘সাইরু রিসোর্টের রিসিপশনের দেয়ালে বড় করে আমরা সাইরুর প্রেম কাহিনি ইংরেজি ভাষায় লিপিবদ্ধ করে রেখেছি।’

স্থানীয়রা বিশ্বাস করে, প্রেমিকা সাইরু দাঁড়িয়ে আছেন ফুলসুমারি গাছ হয়ে। তাঁকে আলিঙ্গন করে আছে ধারমারা গাছরূপী নাম না জানা সেই প্রেমিক যুবক।’ ফুলসুমারি গাছকে ম্রো ভাষায় বলা হয় ত্রুং এবং ধারমারা গাছকে বলা হয় রনখা। কেউ কেউ এর আরো একটি আলাদা নাম দিয়েছেন। তাঁরা বলেন, ত্রু-রুমখা তং (ত্রুং-রুমখা অর্থ প্রেমের পাহাড় চূড়া)।

সাইরু রিসোর্টে থেকেছেন, এমন অনেকে বলেন, গভীর রাতে তাঁরা কোনো এক নারী কণ্ঠের গান শুনতে পেয়েছেন ! তাঁরাও বিশ্বাস করেন, হয়তো এখনো সাইরুর অতৃপ্ত আত্মা বেঁচে আছেন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

পূর্বের সংবাদ

January 2019
M T W T F S S
« Dec    
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  

এই সপ্তাহের আলোকিত পাহাড় প্রথম পাতা

এই সপ্তাহের আলোকিত পাহাড় শেষ পাতা

বিজ্ঞাপন