খাগড়াছড়ি, , বুধবার, ২৩ মে ২০১৮

পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের ব্যক্তি স্বার্থের কাছে জিম্মি সমাজ ও রাষ্ট্র

প্রকাশ: ২০১৮-০৪-২৯ ১৯:০৯:১৭ || আপডেট: ২০১৮-০৪-২৯ ১৯:০৯:৫৮

“কিছু একটা বোধগম্য না হতেই চিৎকার দিয়ে বললাম কি হয়েছে, কি হয়েছে! তখন উত্তর-পশ্চিম কোণের পায়খানা ঘরের রাস্তার মুখে (বড় ব্যারাকে একদম সন্নিকটে আমাদের এল এম জি ম্যানের খুব কাছাকাছি) থেকে সোজা দক্ষিণ দিকে লিডারকে লক্ষ্য করে ক্রমাগত ব্রাশ ফায়ার করছে, অন্যজন আমাকে ও সন্ত স্যারকে লক্ষ্য করে ব্রাশ ফায়ার করে চলেছে। আর বিশ্বাসঘাতকেরা “ইয়া আলী, ইয়া আলী” শব্দ করছে। এবং আবুল্যা অ্যাডভান্স, অ্যাডভান্স করে বিকৃত গলার স্বরে শব্দগুলো উচ্চারণ করছে।” (ফিরে দেখা শান্তি বাহিনীর গৃহযুদ্ধ, স্বপ্নের অপমৃত্যু, উৎপল খীসা, পৃষ্ঠা ৫২-৫২ দ্রষ্টব্য) )।

ঘটনাটি তথাকথিত ‘জুম্ম জাতীয়তাবাদের’ প্রবক্তা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার হত্যার উদ্দেশ্যে শান্তিবাহিনীর বিদ্রোহী গ্রুপের পরিচালিত আক্রমণের বর্ণনা। পেশাজীবন শিক্ষকতা দিয়ে শুরু করলেও রাজনৈতিক জীবনে তিনি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ এবং স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। তার অন্যতম বড় পরিচয়, তিনি ছিলেন ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’র সভাপতি এবং ‘জুম্ম মুক্তি আন্দোলনের’ স্বপ্নদ্রষ্টা। ‘জুম্ম জাতীয়তাবাদের’ স্লোগান তুলে তিনি নিজেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের মহল বিশেষের কাছে অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

“বন্দুকের নল থেকেই রাজনৈতিক ক্ষমতা বেড়িয়ে আসে। সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়েই কেবল মাত্র  জোর করে বুর্জোয়া সরকারের কাছ থেকে অধিকার ছিনিয়ে আনা সম্ভব”

– এই নীতির ভিত্তিতে ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’ যাত্রা শুরু করে। অঙ্গসংগঠন হিসেবে আত্নপ্রকাশ করে ‘পাহাড়ী ছাত্র সমিতি’ এবং ১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারিতে সশস্ত্র শাখা ‘শান্তি বাহিনী’ গঠিত হয়। যদিও, ‘পূর্ণাঙ্গ সশস্ত্র তৎপরতা পরিচালনার লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের নভেম্বর/ডিসেম্বর মাসেই  সশস্ত্র ট্রেনিং শুরু হয়’।(পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ– পরিস্থিতির মূল্যায়ন, মেজর জেনারেল অব. সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহীম, পৃষ্ঠা ৮৮-৯৪, মাওলা ব্রাদার্স, ২০১১, দ্রষ্টব্য)।

শান্তিচুক্তির আগে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র  সংগঠন শান্তি বাহিনীর সবচেয়ে বড় নেতার উপর সংঘটিত এই আক্রমণের বর্ণনা শুনে পাঠকের মনে যাই আসুক না কেন, এই ঘটনায় কিন্তু কোন মুসলিম বা বাঙ্গালী অংশগ্রহণ করেনি। বরং শান্তিবাহিনীরই একটা গ্রুপ তাকে হত্যা করে। যেখানে, ‘চক্রান্তকারীরা বাংলাদেশ আর্মি ভান করে’ সেনাবাহিনীর উপর দোষ চাপাতে এই বিশ্বাসঘাতকতা ও কৌশল অবলম্বন করে। ১০ নভেম্বর ১৯৮৩ সালের এই ঘটনায় এম এন লারমাসহ ৮ জন   ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায়। (ফিরে দেখা শান্তি বাহিনীর গৃহযুদ্ধ, স্বপ্নের অপমৃত্যু, উৎপল খীসা, পৃষ্ঠা ৫৪ দ্রষ্টব্য)। যদি এই ঘটনায় জড়িত প্রকৃত দোষীদের সময়মত চিহ্নিত না করা যেত, তাহলে কল্পনা চাকমার মতো আরো একটি ইস্যু সৃষ্টি করে কার প্রতি আঙ্গুল তোলা হতো, সেটা বলাই বাহুল্য। এই ঘটনার পাশাপাশি পরবর্তীতে সংঘটিত অনেক ঘটনার মাধ্যমে, এটা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে যে, নিজ স্বার্থে এই সশস্ত্র দলগুলো যে কাউকেই হত্যা করতে পারে।

পার্বত্যাঞ্চলে সঙ্ঘটিত শুধুমাত্র কিছু জ্ঞাত ঘটনার দিকে তাকালেই এই ধারণাটা অনেকটা স্বতঃসিদ্ধ বলেই প্রতিয়মান হয়। জ্ঞাত ঘটনা বেছে নেয়ার কারণ হল, বিতর্ক এড়ানো।

‘পাহাড়ে সহিংস ঘটনার দায় কার ?’ শিরোনামে ২৬ অক্টোবর ২০১৩ তারিখে ‘পাহাড়২৪’ অনলাইন পত্রিকায় এক প্রতিবেদনে ঐ সময়ের তিনটি রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয় যে, সঙ্ঘাত, সহিংসতা আর প্রাণহানির জন্যে সাধারণ মানুষ অসহায় অবস্থায় আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ঐ প্রতিবেদনে, পার্বত্য চট্টগ্রামে চলা প্রতিটি সহিংস ঘটনার জন্য সন্তু লারমা’র নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) কে দায়ী করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর কেন্দ্রীয় নেতা প্রদীপন খীসা বলেন, “তারা আমাদের ২৪৬ জনেরও অধিক কর্মী সমর্থককে হত্যা করেছে। এবং এক হাজারের অধিক অপহরণের ঘটনা ঘটিয়েছে।” একই প্রতিবেদনে, জেএসএস (এমএন লারমা)’র খাগড়াছড়ি জেলা সভাপতি সুধাকর চাকমা দাবী করেন, “তারা (সন্তু লারমা’র নেতৃত্বাধীন জেএসএস) ২০১০ সাল থেকে আমাদের ৭০ জনেরও অধিক কর্মী সমর্থককে হত্যা করেছে।”

এ প্রসঙ্গে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস এর সহসভাপতি উষাতন তালুকদার বলেন,

“যদি দুই পক্ষের কাছে অস্ত্র থাকে তাহলে গোলাগুলিতো হবেই। আর গোলাগুলি হলেই নিহত বা আহত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এমন ঘটনায় নিজেদের লোক নিহত হলে অন্য দলকে দায়ী করা স্বাভাবিক বিষয়।”

‘পাহাড়ে এক দিনে তিন খুন’ শিরোনামে প্রকাশিত ১৫ জুলাই, ২০১৩ তারিখের বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক প্রতিবেদন অনুসারে,

“আধিপত্য বিস্তার নিয়ে পার্বত্য অঞ্চলে এখন নিয়মিতই বন্দুকযুদ্ধ, খুন, অপহরণ, গুম ও চাঁদাবাজি ঘটছে। স্থানীয়দের উদ্ধৃত করে, এই প্রতিবেদনে দাবী করা হয়, “এ কয়েক বছরে বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে কয়েকশ’বার, খুন হয়েছে প্রায় ৬০০ জন, অপহরণ হয়েছে কয়েকশ’, চাঁদা দিতে হয়েছে কয়েক হাজার জনকে, গুম হয়েছে প্রায় ৫০ জনেরও বেশি। এ ছাড়াও ধর্ষণের ঘটনাসহ নানা ভীতিকর পরিস্থিতি ঘটে আসছে।”

২০১৪ সালের ৩০ আগস্টে রাঙামাটির নানিয়ারচরের ঘিলাছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের প্রাক্তন সদস্য ও জেএসএস সমর্থক শান্তি কুমার চাকমাকে (৬৫) গুলি করে হত্যার জন্য ইউপিডিএফকে দায়ী করা হয়। তবে, ইউপিডিএফের তরফ হতে জানানো হয়, “জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র সদস্য রামহরি পাড়ায় অবস্থান করে। তারাই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ইউপিডিএফকে দোষারোপ করছে। আমরা এ ঘটনার জন্য দায়ী নই।” (আজকের সংবাদ, ৩১ আগস্ট ২০১৪)।

“এক শুক্রবারের বিকেলে জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) কর্মী মকবুল চাকমাকে,  রাস্তা থেকে এক লোক ডেকে নিয়ে যায় নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের আমতলী এলাকায়। কিছুক্ষণ পর গুলির আওয়াজ শুনে স্থানীয় লোকজন গিয়ে মকবুল চাকমাকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে রাঙামাটি সদর হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন”। ১৩ মে ২০১৬ তারিখে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের জন্যে জেএসএস দোষারোপ করেছে ইউপিডিএফকে; তবে ইউপিডিএফ তা অস্বীকার করেছে। (সূত্র- এনটিভিবিডি.কম, ১৩ মে ২০১৬)।

গত ৩ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় ইউপিডিএফ এর কেন্দ্রীয় নেতা ও খাগড়াছড়ি জেলা সংগঠক মিঠুন চাকমা। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গত ৬ ও ৭ জানুয়ারি খাগড়াছড়ি জেলায় দুইদিন সড়ক অবরোধ পালন করে ইউপিডিএফ।

“প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ এ হত্যাকাণ্ডের জন্য ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিককে দায়ী করে আসছে। তবে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক এ হত্যাকাণ্ডে তাদের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে বলছেন, এটি প্রসীতের ইউপিডিএফ’র আভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে হয়েছে।” (সূত্র- পার্বত্যনিউজ, ৯ জানুয়ারি ২০১৮)।

সম্প্রতি ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এর দুই শীর্ষ নেতা পার্বত্যনিউজের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, ১৯৯৮ সালে ইউপিডিএফ গঠিত হওয়ার পর থেকেই “শুরু হয় সন্তু ও প্রসীতের নেতৃত্বে আধিপত্য বিস্তার ও রক্ষার লড়াই। এসময় থেকে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক চাঁদাবাজি, হত্যা ও অপহরণের পাশাপাশি নিরাপত্তার বাহিনীর সাথে মাঝে মধ্যে বন্দুক যুদ্ধে লিপ্ত হতে থাকে তারা। এতে প্রাণ হারায় বহু নেতাকর্মী।”

একই সাক্ষাতকার হতে আরো জানা যায় যে, ‘বাঙ্গালী ছেলের সাথে পাহাড়ী মেয়ের প্রেম বা বিয়ের ক্ষেত্রে ইউপিডিএফের সাংগঠনিকভাবে বাঁধা রয়েছে’। এক্ষেত্রে “অবাধ্য হলে নিলামে তোলা, মৃত্যুদণ্ডসহ চরম খেসারত দিতে হয়’। ……… রীনা দেওয়ান ও কবিতাসহ অনেক নারীদের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘ইউপিডিএফের সহযোগী সংগঠন পিসিপি ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রীদের পার্টির বাইরে কাউকে বিয়ে করার সুযোগ নেই।’ (সূত্র- পার্বত্যনিউজ, ১ ফেব্রুয়ারী ২০১৮)।

রাঙামাটির নানিয়ারচর থানায় গত ২৬ এপ্রিল ২০১৮ তারিখের দায়েরকৃত এক মামলার সূত্রে জানা যায় যে, জেএসএস (এমএন লারমা গ্রুপ) নেতা কালোময় চাকমাকে আর্মি রংয়ের পোশাক পরিহিত ৩০-৪০ জনের সশস্ত্র একটি দল নানিয়ারচর বাজার থেকে বেঁধে নিয়ে যায় এবং পরের দিন তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। এই হত্যাকাণ্ডের জন্যে ইউপিডিএফ মূল দলকে দায়ী করে আরো অভিযোগ করা হয় যে, “অভিযুক্ত ব্যক্তিরা অতীতে শান্তি চুক্তির পক্ষের নিরীহ ৫ হাজার মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তাদের বিরুদ্ধে কেউ মামলা করতে সাহস পায় না ।” (সূত্র- পার্বত্যনিউজ, ২৭ এপ্রিল ২০১৮)।

সম্প্রতি আত্নপ্রকাশকৃত ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) কর্তৃক প্রকাশিত এক খোলা চিঠিতে এমনও দাবী করা হয়েছে যে, সশস্ত্র সংগঠনের হাতে নিজ দলের কর্মীরা পর্যন্ত নিরাপদ নয়। ১৮ জন পাহাড়ি নেতাকর্মীর নাম ঠিকানা উল্লেখ করে ঐ খোলা চিঠিতে দাবী করা হয় যে, বিভিন্ন কারণে ইউপিডিএফের কর্মী হওয়া সত্ত্বেও ইউপিডিএফ এদের হত্যা করেছে। তন্মধ্যে একজনের ব্যাপারে বলা হয়েছে, “অনিল চাকমা (গোর্কি) ইউপিডিএফ ত্যাগ করার কারণে সবচেয়ে সাহসী এবং দক্ষ কমান্ডার রয়েল মার্মাকে আনন্দ প্রকাশ চাকমা ও রতন বসু মার্মার (জয় মার্মা) যোগসাজসে অভিনব কায়দায় রয়েল মার্মাকে লক্ষীছড়ির রক্তছড়ি এলাকায় হত্যা করা হয়। যেখানে মার্মা জনগোষ্ঠীর মাঝে এখনো রয়েল মার্মা মৃত্যুর পিছনে রহস্যাবৃত রয়েছে।”

এমন অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে। যত উদাহরণ দেয়া যাবে, তার থেকে অনেক অনেক বেশী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে এই পাহাড়ের আনাচে কানাচে। তন্মধ্যে বেশিরভাগই প্রকাশ পায় না;  কারণ, ভিক্টিমরা আর যাই করুক আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সশস্ত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে কথা বলার দুঃসাহস বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দেখাতে পারে না। এরপরেও বর্তমান যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সোশ্যাল মিডিয়ার সহজলভ্যতা  আর নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসনের ক্রমবর্ধমান কার্যকরী ভুমিকার কারণে কিছু কিছু ঘটনা জনসম্মুখে চলে আসে; যার অতি নগণ্য কয়েকটি এখানে তুলে ধরা হয়েছে শুধুমাত্র উদাহরণ হিসেবে।

এ প্রেক্ষাপটে, আমরা যারা বর্তমান প্রজন্মের, যখন অতীতে সংগঠিত বিভিন্ন ঘটনার কথা শুনি, তখন স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে, তাহলে অতীতের এমন ঘটনাবলীর পিছনে কাদের হাত থাকতে পারে? যেমন ধরুন, এই নিচের টেবিলের ঘটনাবলীর জন্যে আমরা কাদেরকে দায়ী  ধরে নেবো?

প্রাসঙ্গিক ভাবেই বলতে হয়, শান্তি চুক্তির পরে পার্বত্য অঞ্চলের আনাচে কানাচে ঘুরে  শান্তি বাহিনীর সন্তু লারমা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের কমান্ডারদের কথা বলে সাংবাদিক গোলাম মোর্তোজা প্রকাশ করেন ‘শান্তি বাহিনী গেরিলা জীবন’ (সময় প্রকাশন, ২০০০)। বইটি পাহাড়িদের এতই পছন্দ হয়েছে যে, সুবিনয় চাকমা নামের রাঙ্গামাটির এক অপরিচিত পাহাড়ি লেখককে ফোন করে বলেছিলেন, “আমাদের স্বপ্নের জুম্মল্যান্ডের নাগরিকত্ব দেয়া হবে আপনাকে।” অন্যদিকে, সামরিক বাহিনীর এক সদস্য বলেছিলেন, “আপনি পাহাড়িদের পক্ষ নিয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে লিখেছেন।”  উক্ত বইয়ে শান্তি বাহিনীর নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তির সূত্রে দাবী করা হয়েছে যে, “সশস্ত্র সংগ্রাম করতে গিয়ে এ পর্যন্ত আমাদের ২১৭ জন গেরিলা শহীদ হয়েছেন।” (পৃষ্ঠা ১২৪)। অপরপক্ষে, লে. আবু রুশদের পূর্বোক্ত বই মোতাবেক ১৯৭৬ হতে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর ৩৩০ জন নিহত এবং ৩৬৭ আহত হয় (পৃষ্ঠা ৬৫); যার বাহিনী অনুযায়ী সংখ্যা নিম্নরূপঃ

দেশের অখণ্ডতার জন্যে যারা প্রাণ দিলেন বা চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করলেন, তাদের সংখ্যাটা কিন্তু এখানেই থেমে নেই, বরং ১৯৯৫ সালের পরেও অনেকেই আহত বা নিহত হয়েছেন। এক তথ্যে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে শুধু সেনাবাহিনীরই ৩৫১ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ৩৮৪ জন এবং অন্যভাবে ২২৭ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। (সূত্র: পার্বত্য চট্টগ্রামের সেনাবাহিনীর কি কাজ, মেহেদী হাসান পলাশ, ১৬ আগস্ট, ২০১৬)  এই সংখ্যা ক্রম বর্ধমান, গত বছর জুনে রাঙ্গামাটিতে ভুমিধ্বসে ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধারের সময় সেনাবাহিনীর এক মেজরসহ ৫ জন ঘটনাস্থলেই শাহাদত বরণ করেছেন। স্মরণযোগ্য যে, এরপরেও দেশের মুল ভুখণ্ডের এক বিশাল জনগোষ্ঠী স্বভাবজাত উদারতায় পাহাড়িদেরকে  আপন করে নেয়ার প্রচেষ্টায় রত।

অন্যদিকে, যারা নিজের ব্যক্তি স্বার্থে অন্যের উপর জুলুম করতে দ্বিধা করে না, এমন কি মত ভিন্নতার কারণে স্বজাতিকেও হত্যায় পর্যন্ত পিছপা হয় না। তারা এখনো সক্রিয় দেশের বিরুদ্ধে, দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে। প্রতিনিয়তই তাদের হাতে প্রাণ হারাচ্ছে নিরীহ মানুষ, পাহাড়ি ও বাঙ্গালী উভয়ই; ভুলুন্ঠিত হচ্ছে মানবাধিকার, সহিংসতার শিকার হচ্ছে নারী সমাজ। আর অগণিত নিরীহ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আতঙ্ক ও উদ্বেগতো লেগেই আছে। তাই, অনেক সময়ই মনে হয়, পাহাড়ের সন্ত্রাসীদের ব্যক্তি স্বার্থে পার্বত্য অঞ্চলের সমাজের সাথে সাথে আমাদের রাষ্ট্রও যেন প্রায় জিম্মি  হতে চলেছে।

তথ্যসূত্র:

  • ইব্রাহিম, ম. জ. (২০১১). পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ- পরিস্থিতির মূল্যায়ন. ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স.
  • খীসা, উ. (২০১৬). ফিরে দেখা শান্তি বাহিনীর গৃহযুদ্ধ স্বপ্নের অপমৃত্যু. ঢাকা: শ্রাবণ প্রকাশনী .
  • রুশদ, ল. (. (১৯৯৭). পার্বত্য চট্ট্রগ্রাম, শান্তি বাহিনী ও মানবাধিকার. ঢাকা: জেড আর প্রকাশনী

♦ মাহের ইসলাম: পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।

Leave a Reply

পূর্বের সংবাদ

May 2018
M T W T F S S
« Apr    
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  

এই সপ্তাহের আলোকিত পাহাড় প্রথম পাতা

এই সপ্তাহের আলোকিত পাহাড় শেষ পাতা

বিজ্ঞাপন

error: Content is protected !!