খাগড়াছড়ি, , শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০

অনলাইন ক্লাশ নিয়ে আমার কিছু কথা —– চম্পানন চাকমা

প্রকাশ: ২০২০-১০-২৪ ১৬:৪৩:২৭ || আপডেট: ২০২০-১০-২৪ ১৬:৪৩:২৯

কোভিড ১৯ এর কারনে সারা দেশে ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে সকল ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার এ ক্ষতি পূরনের জন্য সরকার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহ বিভিন্ন উদ্যেগ গ্রহন করেছে। সরকার বাংলাদেশ সংসদ টিভির মাধ্যমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ধারাবাহিকভাবে পাঠদান সম্প্রচার করছে। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ,মাধ্যমিক পর্যায়ের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের একাডেমিক এ ক্ষতি উত্তরনের জন্য অনলাইন শ্রেনি কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিভিন্ন দিক নির্দেশনা প্রদান করেছেন।অনলাইন শ্রেনি কার্যক্রমে প্রতিষ্ঠান সমূহের শিক্ষকবৃন্দ জুম এপস, ফেসবুক লাইভ বা ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে পাঠদান অব্যাহত রেখেছেন। ঢাকা শহর সহ অন্যান্য বিভাগীয় শহরের শিক্ষার্থীদের এ মহামারী সময়ে অনলাইন ক্লাশসমূহ যথেষ্ঠ উপকারে আসছে।বিশেষ করে জুম এপসের মাধ্যমে নেয়া অনলাইন ক্লাশ খুবই ফলপ্রসু হচ্ছে।কারন এ এপসের মাধ্যমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সরাসরি সম্পৃক্ত হচ্ছেন। ঢাকা শহরের অনেক সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় জুম এপসের মাধ্যমে অনলাইন শ্রেনিকার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন।ঢাকা শহরের জুম এপস ব্যবহার করতে পারার মূল কারন হল ইন্টারনেটের স্পিড থাকা এবং অধিকাংশ শিক্ষার্থী বা অভিভাবকদের স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ সঙ্গে থাকা। আমার এক বন্ধুর মেয়ে ঢাকায় এক নামকরা স্কুলে (গ্রীন হেলার ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল) পড়ালেখা করে। ঐ স্কুলে নিয়মিত অনলাইন ক্লাশ হচ্ছে। লক্ষ্য করলাম মেয়ের সাথে আমার বন্ধু বা বৌদি ল্যাপটপের সামনে বসে ক্লাশে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু পার্বত্য অঞ্চল সহ অন্যান্য প্রত্যন্ত অঞ্চলে কয়জন অভিভাবক তাদের সন্তানের সাথে অনলাইন ক্লাশে অংশ নিচ্ছে।

বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলে যেসব শিক্ষার্থী প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করে তারা আধুনিক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাদের ঘরে নেই কোন টিভি বা স্মার্ট ফোন বা ল্যাপটপ বা বাড়ীতে বিদ্যুৎ সংযোগ। তাদের অধিকাংশ অভিভাবক আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল। পার্বত্য এলাকায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের অভিভাবকদের পেশা হল অধিকাংশ জুমিয়া। তারা বন-জঙ্গল থেকে বিভিন্ন সবজি সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রী করে। ঐ টাকা দিয়ে তারা দুমুটো আহার গ্রহন করে। যেমন তারা ঢেঁকি শাক,বনের আলু (প্রাকৃতিক),কলাত্তুর, বনের কচি কলা গাছ, মারফা, সিনার, বাঁশ কোড়ল, লাকড়ী সহ বিভিন্ন শাকসবজি। তাই তাদের আধুনিক ডিভাইস যেমন স্মার্ট ফোন বা ল্যাপটপ কিনার ইচ্ছা থাকলেও সামর্থ্য নেই। আবার পার্বত্য এলাকায় শহরাঞ্চলে যারা বসবাস করে যেমন সরকারি/ বেসরকারি চাকরীজীবি বা আইনজীবি বা ব্যবসায়ী বা সংবাদকর্মী এসব পেশায় নিয়োজিত অভিভাবকদের আধুনিক ডিভাইস ব্যবহার করা বা ক্রয় করার সামর্থ্য রয়েছে। তাই তাদের সন্তানেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত অনলাইন ক্লাশে সম্পৃক্ত হতে পারছে। কিন্তু যেসব অভিভাবকের পেশা দিনমজুর, কুলি, মুচি, নাপিত, গাড়ীর হেল্পার, রাজমিস্ত্রীর হেল্পার, কাঠমিস্ত্রীর হেল্পার, রঙ মিস্ত্রীর হেলপার, স্যানিটারী মিস্ত্রীর হেলপার, মুদির দোকানের কর্মচারী, রিক্সা ড্রাইভার, সবজি বিক্রেতা, ভ্যানচালক ইত্যাদি এসব নিম্ন আয়ের অভিভাবকদের আধুনিক ডিভাইস কেনার ইচ্ছা থাকলেও, সামর্থ্য বা ডিভাইস ব্যবহার করার সক্ষমতা নেই। তাই তাদের সন্তানেরা অনলাইন ক্লাশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর পার্বত্য এলাকায় আরো কিছু অভিভাবক আছেন তাদের আধুনিক ডিভাইস থাকলেও ব্যবহার করতে পারছেনা। নেটের সমস্যা বা ডাটা ক্রয়ের সক্ষমতা না থাকার কারনে তারা ডিভাইসগুলো ব্যবহার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অথবা ডিভাইস আছে কিন্তু ব্যবহার করার সক্ষমতা নাই। যারফলে সকল শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাশে সম্পৃক্ত হতে পারছেনা। বিশেষ করে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জেলা সদরের শিক্ষার্থীরাও অনলাইন ক্লাশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

খাগড়াছড়ি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীর জরিপ করে দেখা গেছে মাত্র ৭% শিক্ষার্থীর ঘরে স্মার্ট ফোন আছে।তাই বাকী ৯৩% শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাশ থেকে বঞ্চিত।তারপরও পার্বত্য এলাকায় জুম এপসের মাধ্যমে অনলাইন ক্লাশ পরিচালনা সম্ভব না হলেও, ফেসবুক লাইভ বা ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে জেলা সদরের কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনলাইন শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবুও আশার আলো হল বাংলাদেশে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম নতুন হলেও বর্তমান সরকারের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার কারনে এ অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম অনেক অগ্রগতি হয়েছে। পরবর্তীতে পার্বত্য এলাকাসহ অন্যান্য প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিনামূল্যে ইন্টারনেটের সুবিধা সহ শিক্ষার্থীদের স্বল্পমূল্যে ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন কেনার ঋন প্রদান করলে অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম ঢাকার মত পার্বত্য এলাকাতেও এগিয়ে নেয়া সম্ভব। তবে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের এ বিষয়ে আরো সদিচ্ছা ও সচেতন হতে হবে।

চম্পানন চাকমা, সিনিয়র শিক্ষক, খাগড়াছড়ি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.